শহরাঞ্চলে বহুতল ভবনের ভিড় বাড়ছে, প্রশস্ত হচ্ছে সড়ক, একের পর এক নির্মিত হচ্ছে ফ্লাইওভার। তবে এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের খেলার মাঠ, পুকুর ও উঠান। একই ভবনে পাশাপাশি বসবাস করেও এখন অনেকের সঙ্গে প্রতিবেশীর পরিচয়টুকুও হচ্ছে না। ফলে আবাসিক এলাকাগুলো হয়ে উঠছে কেবল ঘুমানোর জায়গা। নগরায়ণের এই বর্তমান ধারার পরিবর্তন ঘটিয়ে মানুষের পারস্পরিক মেলামেশা, খেলাধুলা এবং প্রতিবেশী সম্পর্কের গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নগর-পরিকল্পনাবিদগণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শহরগুলোকে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর কিংবা লন্ডন ও নিউইয়র্কের আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনা করতে হবে। উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল ভবনের উচ্চতা কিংবা অবকাঠামোর পরিমাণ দিয়ে নির্ধারণ করলে চলবে না; বরং মানুষ সেখানে কতটা সুস্থ, নিরাপদ এবং সামাজিকভাবে সংযুক্ত জীবন অতিবাহিত করতে পারছে, সেটি বিবেচনা করা জরুরি।

বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) আয়োজিত একটি ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশের নগরায়ণের উন্নয়ন দর্শন’।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাড়া-মহল্লা, পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এগুলো কেবল বসবাসের স্থান বা প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবেই ছিল না, বরং পারস্পরিক পরিচয়, সহযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগ এবং শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার প্রসারের ফলে এই সুযোগগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আমাদের নগরায়ণ দর্শন হতে হবে বাংলাদেশের মাটি, পানি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।’ তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য একটি সুস্থ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।

আইপিডির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে বলা হয়, পরিকল্পনাহীন এবং অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থা নগরের সামাজিক সংযোগকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে কিছু সীমানাঘেরা আবাসন ও আবাসিক কমপ্লেক্সে শ্রেণিভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা, সীমিত জনপরিসর এবং বাইরের সমাজের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব পরিলক্ষিত হতে পারে।

অন্যদিকে, খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানের অভাবের কারণে শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের পথ সংকুচিত হচ্ছে। তাদের জীবন যদি কেবল ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার এবং ডিজিটাল পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে দলগত কাজ, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও বিরোধ মীমাংসার মতো প্রয়োজনীয় সামাজিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ কমে যায়। নিরাপদ মাঠ এবং স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিশু-কিশোরদের সুস্থ বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করে আইপিডি।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে সংস্থাটি ‘পুকুর–উঠান–পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ’ ধারণাকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুকুর ও জলাশয় হবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পানি ব্যবস্থাপনার অংশ। উঠান ও উন্মুক্ত স্থানগুলো হবে মানুষের পারস্পরিক মেলামেশার ক্ষেত্র। এছাড়া পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় পরিচয়, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং প্রতিবেশী সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। আইপিডি স্পষ্ট করেছে যে, এটি অতীতের নগরব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়, বরং ঐতিহ্যের ইতিবাচক উপাদানগুলোকে আধুনিক পরিকল্পনায় ফিরিয়ে আনার একটি প্রস্তাব।

আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, শুধু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) বৃদ্ধি বা বড় অবকাঠামো নির্মাণকেই নগরায়ণ বলা চলে না। প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণে অর্থনৈতিক করিডরভিত্তিক উন্নয়নের পরামর্শ দেন।

বিআইপির সভাপতি মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন দর্শনের বদলে ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থ নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ময়মনসিংহের মতো মাঝারি শহরেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আবাসিক এলাকা এখন কেবল ঘুমানোর জায়গা, অথচ এসব এলাকা মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে প্রাণবন্ত থাকার কথা ছিল।

নগরের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় পুকুর, খাল ও জলাভূমির আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে আইপিডি। এসবের ব্যবস্থাপনায় পাড়া-মহল্লার সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। নতুন আবাসনে খেলার জায়গা, হাঁটার পথ ও সামাজিক যোগাযোগের স্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরোনো এলাকায় এই সুবিধাগুলো পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানানো হয়।

প্রতিটি ওয়ার্ডে মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি নিরূপণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহাবস্থানের সুযোগ রাখার সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আলোচনায় আরও অংশ নেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ উল্লাহ, প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ, আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল, পরিকল্পনাবিদ জিনিয়াস জান্নাত ও কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম।