মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কেনাকাটা ও ঠিকাদারি কার্যক্রম নিয়ে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসছে। রোগীদের খাবার সরবরাহের প্রায় ২ কোটি টাকার টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার ঘটনাটি যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, তখনই স্টেশনারি মালামাল সংগ্রহের দরপত্রেও একই ধরনের অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে।
ই-জিপি পোর্টালে প্রকাশিত দরপত্র উন্মুক্তকরণ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্টেশনারি সামগ্রী সংগ্রহের জন্য মোট ছয়টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছিল। এর মধ্যে মেসার্স সেলিম পেপার্স ৩ শতাংশ মূল্যছাড়সহ ১২ লাখ ৬১ হাজার ৫৯৪ টাকা ৩৮ পয়সা দর প্রস্তাব করে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত দরের তালিকা অনুযায়ী, মো. মিজানুর রহমান ১৩ লাখ ১৯ হাজার ৩৯০ টাকা, ব্রাদার্স স্টোর ১৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, আদিল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ১৩ লাখ ৫২ হাজার ৪৭০ টাকা, ওয়েলনেস ট্রেডিং ১৪ লাখ ৫১ হাজার ৯৯৬ টাকা ৮৪ পয়সা এবং মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশন ১৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯৭ টাকা ৮ পয়সা দর প্রস্তাব করেছিল।
হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দরদাতা মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশনের প্রস্তাবিত মূল্য সর্বনিম্ন দরদাতা সেলিম পেপার্সের তুলনায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৯০২ টাকা ৭০ পয়সা বেশি। নথিপত্রে দেখা যায়, ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাস্টার মাইন্ডের দরই ছিল সর্বোচ্চ। এই প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং কার্যাদেশসংক্রান্ত নথিগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সরকারি ক্রয়বিধির নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পাওয়ার যোগ্য হয় না। দরপত্রের শর্তাবলি, কারিগরি সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেলিম পেপার্সকে বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল, প্রতিষ্ঠানটি কোন শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল এবং মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশনকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়েছে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তে জানা গেছে, মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশন ও ওয়েলনেস ট্রেডিং—এই দুটি প্রতিষ্ঠানেরই স্বত্বাধিকারী একজন ব্যক্তি, যার নাম ওয়ায়েস খান। তিনি মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক এবং বর্তমানে মিটফোর্ড জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহানের নিকটাত্মীয় বলে জানা গেছে।
এর আগে হাসপাতালের রোগীদের খাবার সরবরাহের প্রায় ২ কোটি টাকার দরপত্র নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে যে, ওই দরপত্রেও সর্বনিম্ন দরদাতাকে সরিয়ে দিয়ে ওয়েলনেস ট্রেডিংকে প্রায় ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৮২২ টাকা বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে। একই ব্যক্তির মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান হাসপাতালের দুটি ভিন্ন দরপত্রে কাজ পাওয়ায় কার্যাদেশ প্রদানের স্বচ্ছতা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মাস্টার মাইন্ড ইনকর্পোরেশন ও ওয়েলনেস ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী ওয়ায়েস খানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ, ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহানের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং দরপত্র পেতে ওই কর্মকর্তার প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তবে তিনি এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি। বরং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
স্টেশনারি ও খাবার সরবরাহের দরপত্র প্রক্রিয়া এবং চুক্তি সম্পাদনের সময় মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা তৎকালীন হাসপাতাল সুপার সাজ্জাদ হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
এদিকে প্রশাসনিক স্তরে এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমান হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নাসিম আখতার বলেন, “হাসপাতালের টেন্ডারসংক্রান্ত প্রক্রিয়া ও চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টি প্রশাসনিক কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এ-সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ ও দাপ্তরিক কিছু বিষয় গোপনীয় থাকায় টেন্ডারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর বর্তমান টেন্ডার অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদনের সময় আমি মেহেরপুর জেলায় কর্মরত ছিলাম না।”
এই বিষয়ে মেহেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. একেএম আবু সাঈদ জানান, মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের টেন্ডারসংক্রান্ত কোনো কমিটিতে তিনি ছিলেন না। তিনি বলেন, “সিভিল সার্জন এবং হাসপাতাল সুপার দুটি সমগ্রেডের পদ। এ কারণে সিভিল সার্জনের পক্ষে জেনারেল হাসপাতালের বিষয়ে তদারকির সুযোগ নেই। আমি শুধু পরামর্শ দিতে পারি।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সরাসরি প্রশাসনিক অধিক্ষেত্রের আওতাভুক্ত নয়। জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার), যিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) অধীন দাপ্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন।