সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকলেও কেবল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এর মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিক অধিকারগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪তম বার্ষিকীর স্মৃতিবিজড়িত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব মত ব্যক্ত করেন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এই বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের এই দিনে তৎকালীন গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণ করে 'বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন' এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সংশ্লিষ্ট আলোচনা সভায় আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং অধিকারকর্মীরা সংবিধান সংশোধনের সীমাবদ্ধতা এবং নাগরিক অধিকার বাস্তবায়নের পথে বিদ্যমান বাধাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষ করে আদালতে প্রতিকার পেতে দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উঠে আসে।

পুরো আলোচনা সভাটি সঞ্চালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন। তিনি সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি স্বাধীনতার পর দেশটিতে ঔপনিবেশিক ও সামরিক শাসনামলের যে আইনগুলো এখনো বহাল রয়েছে, সেগুলোর সংস্কারে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।

সারা হোসেন বলেন, “সংবিধান নিয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ ও অধিকারের প্রশ্ন দুটি আলাদাভাবে দেখতে হবে। সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা ভাবতে হবে। পাশাপাশি দেখতে হবে, সংবিধানে তাদের অধিকার কীভাবে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতার পর দেশে সংবিধান প্রণীত হলেও ঔপনিবেশিক আমলের বহু আইন এখনো কার্যকর। সারা হোসেন বলেন, “সামরিক শাসনামলে প্রণীত অনেক আইনও বহাল রয়েছে। এসব আইন দিয়ে প্রতিদিন মানুষের জীবন ও নাগরিক অধিকার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে আইনগুলো সংস্কারের বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা দেখা দরকার।”

অনুষ্ঠানে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী উন্নয়নকর্মী তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, সংবিধানে সমতার কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুনির্দিষ্ট সুরক্ষার অভাব রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, চাকরি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তাঁদের নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়।

আলোচক নুরুন্নাহার ঊর্মি তাঁর বক্তব্যে বলেন, গণপরিষদের বিতর্কের সময় নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী সংবিধান সংশোধনের আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বলেন, সংবিধান সংশোধন করতে হলে ১৪২ অনুচ্ছেদে নির্ধারিত পদ্ধতি মানতে হবে। এ জন্য সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সংশোধনের মাধ্যমে মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা সংসদকে দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধান ও সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসরণ করতে হবে।

প্রবীর নিয়োগী আরও বলেন, “ভাষা আন্দোলন, যুক্ত ফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের ১৯৬২ সালের সংবিধান প্রণয়নের অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন। সে সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান নিজেই।”

আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিন বলেন, সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিলের বিধান রয়েছে। অধিকার লঙ্ঘিত হলে ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ আছে। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আদালতে যাওয়ার পর প্রতিকার পেতে অনেক সময় লেগে যায়।

সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় তা করা হয় না বলে অভিযোগ করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বোরহান উদ্দিন। তিনি বলেন, “কোনো কোনো ক্ষেত্রে আটক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে যান। নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ায় অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়েই ভোগান্তিতে পড়েন।”

পরিবেশ অধিকারকর্মী বারীশ হাসান চৌধুরী বলেন, সংবিধানে পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেওয়া হয়েছে। তবে আইন বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট করার তাগিদ দেন তিনি। পরিবেশ সুরক্ষার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে সিটি ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ও বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ জাভেদ বলেন, অধিকার প্রয়োগের সুযোগ সবার সমান নয়। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধায় অনেকে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। শ্রমিক, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনে এসব অধিকারের কতটা প্রতিফলন ঘটেছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামান ও ব্যারিস্টার প্রিয় আহসান চৌধুরী।