চাঁদাবাজির ঘটনায় ভুক্তভোগীর সরাসরি অভিযোগের অপেক্ষা না করে পুলিশের নিজস্ব উদ্যোগে মামলা করার সুযোগ করে দিতে আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, চাঁদাবাজদের ভয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় অভিযোগ করতে সাহস পান না, তাই ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে খুলনার বয়রা পুলিশ লাইনে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) আয়োজিত খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে আইজিপি এসব কথা বলেন।
আইজিপি বলেন, “চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে প্রভাবশালী বা ক্ষমাসংশ্লিষ্ট হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সাধারণ মানুষ ভয় পান। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীর সরাসরি অভিযোগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ যাতে নিজ উদ্যোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে, সে লক্ষ্যে আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এই নতুন কাঠামোর আওতায় কমিউনিটি পুলিশিং পুলিশের একটি আনুষ্ঠানিক শাখা হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
কমিউনিটি পুলিশিংয়ের অতীত অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলে আইজিপি জানান, অতীতে এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেছেন। এমনকি ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগও ছিল। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, এসব অনিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে এবং আইনি কাঠামোর ভেতরেই কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালানো হবে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি বলেন, “৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে পুলিশ মনোবল ফিরে পেয়ে আবারও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাতারাতি সবকিছু পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।” এই সময়ে পুলিশকে দুর্বল বা হেয় না করে বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা ও গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়ার জন্য তিনি সবাইকে আহ্বান জানান।
গত ১৭ বছরের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, “গত ১৭ বছরে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সমাজে মাদককে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশ কাজ করছে।”
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আইজিপি বলেন, অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা সমালোচনা হয়। পুলিশ বল প্রয়োগ করলে এক ধরনের সমালোচনা হয়, আবার কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পুলিশের দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি কার্যকর, দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আইজিপি আরও জানান, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব অপরাধ নির্মূলে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধির পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান আইজিপি। অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পরিশেষে আইজিপি বলেন, “পুলিশ মানবিক ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে কাজ করতে চায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে পুলিশ ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”
খুলনা বিভাগের কমিউনিটি পুলিশিংবিষয়ক এই সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম এবং পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি), খুলনার কমান্ড্যান্ট (ডিআইজি) এ কে এম মোশাররফ হোসেন মিয়াজী। পুরো অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান।