পোশাকশিল্পে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা কোনো সাধারণ শ্রমিক আন্দোলন নয় বরং রাজনৈতিক ইন্ধনে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর মতে, সাধারণ শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক সহিংসতা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।
আজ বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনের খসড়া পর্যালোচনাবিষয়ক এক আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, পোশাকশ্রমিকদের বর্তমানে কোনো অমীমাংসিত দাবি নেই। তা সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট মহল চক্রান্ত করে শিল্প খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, সাধারণ শ্রমিকদের এই সহিংসতার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই; বরং শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে কিছু বহিরাগত ও অশ্রমিক ব্যক্তি বিভিন্ন কারখানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসাত্মক কাজ পরিচালনা করছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, "তদন্তে দেখা গেছে, এর পেছনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের কয়েকজন পোশাককারখানার মালিক, সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর রাজনৈতিক এজেন্ডা কাজ করছে। পাশাপাশি দেশকে অস্থিতিশীল করতে মাফিয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী প্রতিবেশী দেশ থেকে পরিচালিত চক্রান্ত বাস্তবায়নে লিপ্ত রয়েছে।" তিনি আরও জানান, এই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা কঠোর হাতে দমনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতি তিন বছর পর নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা ছিল শ্রমিকদের প্রধান দাবি। সরকার এই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ অনেক আগেই নিয়েছিল, তবে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি নাম দিতে দেরি হওয়ায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা বিলম্বিত হয়। নাম পাওয়ার পরপরই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং এর প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিনিয়র জেলা জজ পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধি রয়েছেন। মূল্যস্ফীতি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে বোর্ডটি কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। কোনো অবস্থাতেই যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা না হয়, সে বিষয়ে বাহিনীকে স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও তাঁরা যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছেন এবং শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থেকেছেন। তবে এই সুযোগে কোনো মাফিয়া বা অপরাধী চক্রকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাধারণ শ্রমিকদের কোনো ধরনের উসকানি বা গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি শ্রমিকদের দ্রুত নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, শ্রমিকেরা কাজে ফিরলে শিল্প উৎপাদন সচল থাকবে, যা তাঁদের কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতিকে সুরক্ষিত করবে।
এদিকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটক করার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "তিনি আটক হয়ে থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি আইন অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হবে।"
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
সীমান্ত সুরক্ষায় উন্নয়ন সহযোগীদের আহ্বান
এর আগে আজ সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সীমান্ত সুরক্ষায় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কেবল বাংলাদেশের সীমান্তকেই সুরক্ষিত করবে না, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ বিশ্বায়নে বড় অবদান রাখবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশের বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্টগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে কেবল প্রযুক্তিনির্ভর না করে মানবিক অধিকার ও সুরক্ষার প্রতি সংবেদনশীল করতে হবে এবং একে পেশাদার মানদণ্ডে উন্নীত করতে হবে। তিনি গুরুত্বারোপ করেন যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কোনো একক সংস্থার দায়িত্ব নয়; এর জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ প্রয়াস প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।