খুলনার রূপসায় চাঞ্চল্যকর জয় ঢালী হত্যা মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন আসামি এবং ‘বি’ কোম্পানির সক্রিয় দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৬)। বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে উপজেলার মোসাব্বারপুর এলাকায় এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তারের পর পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য তাদের রূপসা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন ফেরদৌস হোসেন লাদেন (২৩) ও রানা শেখ আকাশ (২৫)। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ফেরদৌস হোসেন লাদেন রূপসা উপজেলার নন্দনপুর গ্রামের আব্দুল গাফফারের ছেলে এবং রানা শেখ আকাশ নগরের সোনাডাঙ্গা থানাধীন নাজিরঘাট এলাকার আতিয়ার শেখের ছেলে।
এসআরবি-৬ থেকে জানানো হয়েছে, বুধবার দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসআরবি-৬ এর সিপিসি সদর কোম্পানির একটি আভিযানিক দল রূপসা থানার মোসাব্বারপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানের সময় জয় ঢালী হত্যা মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে লাদেন ও রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবি-৬ এর অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জয় ঢালী হত্যা মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের রূপসা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত ১৫ আগস্ট রাতে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দূর্জনীমহল এলাকায় দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় নিহত হন জয় ঢালী (২৭)। স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহীদের মোড় এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা চার-পাঁচজনের একটি দল তাকে কুপিয়ে জখম করে। হামলাকারীদের কয়েকজনের মাথায় হেলমেট ছিল। গুরুতর জখম হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
জয় হত্যার দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে একই এলাকায় গুলিতে নিহত হন তার বাবা আক্তার ঢালী (৬০)। বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বেঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে তাকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একই পরিবারের বাবা ও ছেলেকে পর পর হত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, জয় হত্যার পর মামলা প্রত্যাহারের জন্য আক্তার ঢালীর ওপর চাপ সৃষ্টি ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জয় হত্যার ঘটনায় জামিনে মুক্ত হওয়া কয়েকজনের সঙ্গে আক্তার ঢালী হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছিল, এ ঘটনায় পাওয়া বিভিন্ন নাম ও তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, জয় ঢালীর বিয়ে ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে ‘আশিক গ্রুপ’ ও ‘বি’ কোম্পানি নামে পরিচিত একটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। তবে জয় ও তার বাবার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই বিরোধের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে দূর্জনীমহলের ওই ঢালী বাড়িতে মোট সাতজন খুন হয়েছেন। পর পর দুই হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা জেলায় ৩৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রূপসা উপজেলাতেই ঘটেছে ১৪টি হত্যাকাণ্ড।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এসআরবি-৬ গ্রেপ্তার দুজনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। বিধি অনুযায়ী তাদের আদালতে পাঠানো হবে।”
জয় ঢালী হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তে কী তথ্য পাওয়া যায় এবং বাবা আক্তার ঢালী হত্যার সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখন তদন্তের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।