খুলনা মহানগর ও জেলা এলাকায় গত ১২ দিনের ব্যবধানে মোট সাতটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, এই সাতটি খুনের মধ্যে পাঁচটির পেছনেই রয়েছে মাদক সংক্রান্ত বিরোধ। মাদক কারবার, লেনদেন এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এই সময়ের মধ্যে চারজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন এবং কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে দুজনকে।

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল সোমবার দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকায়। আঠারোবেকী নদীর চরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেন রূপসার রাজাপুর এলাকার আবদুল্লাহর ছেলে মেহেদী হাসান (৩৫) ও রেজাউল করিম (৩০)। পুলিশ জানিয়েছে, দুজনের শরীরেই গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যার পর মরদেহগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কেউ মামলা করতে আসেননি। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিক তদন্তে মাদক কারবার নিয়ে বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, মেহেদী হাসানের নামে দুটি মাদক মামলা রয়েছে এবং তিনি একসময় ঘাটের মাঝি ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে, রেজাউলও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং মাদকের বাহক হিসেবে কাজ করতেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

ওসি আরও বলেন, “দুজনই ‘বি কোম্পানি’ নামে পরিচিত অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। ওই গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও মাদক কারবারের বিরোধ এই দুইয়ের জের ধরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে।” এ ঘটনায় কেউ অভিযোগ না করলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে এবং নৌ পুলিশ এই ঘটনার তদন্তভার গ্রহণ করবে।

এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় নগরের রায়েরমহল এলাকায় নিজ রেস্তোরাঁয় কুপিয়ে হত্যা করা হয় খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে। এই ঘটনার পর তাঁর ছেলে সৈয়দ নুর আমিন সৌহার্দ্য বাদী হয়ে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে ১৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহ্বায়ক আরাফাত হোসেনকে। পুলিশ এজাহারভুক্ত আসামি সিদ্দিক শেখকে গ্রেপ্তার করেছে। এদিকে ছাত্রদল আরাফাতকে দলীয় পদ থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্যানুসারে, একটি রেফ্রিজারেটরের বকেয়া কিস্তির টাকা নিয়ে বিরোধের কারণে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে আরাফাতের কথা কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। এরপর সহযোগীদের নিয়ে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এই হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এর আগের দিন, গত শনিবার রাত ১১টার দিকে নগরের লবণচরা এলাকায় দরগা কাশেমিয়া মসজিদ-সংলগ্ন সড়ক থেকে শহীদুল ইসলাম (৩৫) নামের এক যুবকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই এলাকারই বাসিন্দা। পুলিশ জানায়, শহীদুল দু-তিন দিন পরপর বাড়িতে আসতেন। ঘটনার দিন বিকেলে বাড়িতে এসে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তিনি বের হন। পরবর্তীতে রাত ১১টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে সড়কের ওপর তাঁর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নিহত শহীদুল মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও ছিল। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।” এই ঘটনায় শহীদুলের মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং এজাহারে তাঁর ছেলেকে মাদক ব্যবসায়ী উল্লেখ করে মাদক-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যার দাবি করা হয়েছে। তবে ওই মামলায় এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

এর আগে ২২ অক্টোবর খুলনা নগরে পৃথক দুটি ঘটনায় দুজন খুন হন। ওই দিন সকালে তাওহিদুল ইসলাম নামের এক যুবক এবং সন্ধ্যার পর খুশি আক্তার নামের এক নারী হত্যার শিকার হন। পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন। এই গ্রুপের সঙ্গে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে গ্রেনেড বাবুর গ্রুপ বা ‘বি কোম্পানি’র বিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে, খুশি আক্তার গ্রেনেড বাবু গ্রুপের হয়ে মাদক বিক্রি করতেন বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। পুলিশের দাবি, এই দুটি ঘটনার নেপথ্যেই মাদক ও আধিপত্য বিস্তার কাজ করেছে।

তাওহিদুল হত্যার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এজাহারে ‘বি কোম্পানি’র সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে সেজান, সাকিবুর রহমান ওরফে জিতু এবং রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, খুশি হত্যার ঘটনায় তাঁর বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, “এসব মামলায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে শিগগিরই আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ।”

অন্যদিকে, ২৫ অক্টোবর খুলনার সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় বকেয়া ভাড়া চাওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে বাড়িওয়ালার লাঠির আঘাতে রকিবুল ইসলাম (২৪) নামের এক ভাড়াটে নিহত হন। এই ঘটনায় রকিবুলের স্ত্রী হত্যা মামলা করেছেন এবং পুলিশ বাড়িওয়ালা ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে নগর এলাকায় ৩৭টি হত্যা মামলা হয়েছে, যাতে ৩৯ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল।

জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকাতেও খুনের সংখ্যা উদ্বেগজনক। জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি হত্যা মামলা হয়েছিল। চলতি বছরের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ৩৭টি হত্যার ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের বাইরেও জেলায় অন্তত ৩৫টি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।