বাংলাদেশের সকল প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে আগ্রহী চীন। কোনো রাজনৈতিক দল বর্তমানে সরকারের অংশ নাকি বিরোধী ভূমিকায় রয়েছে, সেটিকে বন্ধুত্বের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করে না বেইজিং। বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।

আজ বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় এই কথা জানান চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল মঙ্গলবার রাতে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছান।

ঢাকায় চীন দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত ‘যেখানে ইতিহাস পথ দেখায়: চীন-বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের গণ্ডি ছাড়িয়ে উদ্যোগ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন লিউ হাইসিং। এই অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

বৈঠকে লিউ হাইসিং বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা আদর্শিক বিভাজন তৈরি করি না। কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে আছে, নাকি সরকারের বাইরে, তার ভিত্তিতে আমাদের বন্ধুত্ব নির্ধারণ করি না।’

অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও অংশীদারত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি মনে করেন, দুই দেশের রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে বিএনপি একটি স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রিজভী। চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও বস্ত্র খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, “চীনা বিনিয়োগকারীরা এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেন।” একই সঙ্গে তিনি চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিএনপির এই নেতার মতে, এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময় তা আরও গতিশীল হয়েছে।” তিনি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব, সমতা ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে লিউ হাইসিং বলেন, বর্তমানে দুই দেশই উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। চীন তার ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে, আর বাংলাদেশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে তিনি মনে করেন।

সদ্য উদ্বোধন করা বাংলাদেশ-চীন সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ দুই দেশের শাসনব্যবস্থার ধারণা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন লিউ হাইসিং। তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তরুণ প্রজন্ম, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এই সেন্টারটি কাজ করবে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের আগ্রহও প্রকাশ করেন লিউ হাইসিং। তিনি বলেন, “চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের ফলাফল, বিশেষ করে সি চিন পিংয়ের পার্টি গঠনবিষয়ক চিন্তাধারা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত চীন।”

দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতির কথা তুলে ধরে লিউ হাইসিং জানান, কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরুর সময়ে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র দেড় কোটি ডলার, যা বর্তমানে ২৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশে সড়ক, সেতু, টানেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি মোংলা বন্দর শিল্পাঞ্চল এবং তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অগ্রগতির বিষয়টিও তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ প্রমুখ।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রমুখ।