দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান দখল করেছে চীনের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো। বিনিয়োগের এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। এছাড়া শীর্ষ পাঁচটি বিনিয়োগকারী দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র।
বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রে ইপিজেডগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৮০ সালে প্রথমবার দেশে ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই বিশেষ অঞ্চলগুলোর মূল লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে পণ্য উৎপাদন করে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা; এই পণ্যগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা নিষিদ্ধ। এছাড়া ইপিজেডে পণ্য উৎপাদনের জন্য বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্ক ও কর ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এই অঞ্চলগুলোর তত্ত্বাবধান ও পরিচালনা করে। ১৯৮৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের প্রথম ইপিজেড স্থাপন করা হয়। বর্তমানে বেপজার অধীনে মোট ৮টি ইপিজেড এবং দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বেপজার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব ইপিজেডে এখন পর্যন্ত মোট ৩৮টি দেশের বিনিয়োগ এসেছে। এসব দেশের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৪২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ ১৭৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে শীর্ষ স্থানে রয়েছে চীনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো, যার মধ্যে তাইওয়ান ও হংকংয়ের কোম্পানিগুলোও অন্তর্ভুক্ত। গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই হিসাব পাওয়া গেছে।
বিনিয়োগের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা। তবে যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশ এখানে আলাদাভাবে গণনা করা হয়েছে।
শীর্ষ ১০ বিনিয়োগকারী দেশের তালিকায় অন্যান্য দেশগুলো হলো— দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, শ্রীলঙ্কা, ভারত, কানাডা এবং নেদারল্যান্ডস। এছাড়া তালিকায় আরও রয়েছে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, জার্মানি, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কেম্যান আইল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও স্পেনসহ মোট ৩৮টি দেশ।
বিনিয়োগের পরিমাণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ প্রায় ১২০ কোটি ডলার, জাপানের ৬৪ কোটি ৫০ লাখ, যুক্তরাষ্ট্রের ৪২ কোটি, যুক্তরাজ্যের ৩০ কোটি, শ্রীলঙ্কার ২৬ কোটি, ভারতের ২৬ কোটি, কানাডার ১৪ কোটি এবং নেদারল্যান্ডসের ১২ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ রয়েছে।
গত তিন বছরে বিনিয়োগ প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও চীন সবচেয়ে এগিয়ে। বেপজার তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে বেপজা ৭৩টি নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জমি ইজারার (লিজ) চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত বিনিয়োগের মোট পরিমাণ ১৩১ কোটি ৪৬ লাখ ডলার।
চুক্তি করা এই ৭৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৬টিই চীনা প্রতিষ্ঠান, যদিও এর মধ্যে কিছু যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৮৫ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সম্পূর্ণ বাংলাদেশি মালিকানাধীন ১৫টি প্রতিষ্ঠান, যাদের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ২০ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের ৪টি করে প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।
বিনিয়োগের ধরন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইপিজেডে উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। বর্তমানে চালু থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৩৩ শতাংশ তৈরি পোশাক, ১৮ শতাংশ পোশাক উপকরণ এবং ৮ শতাংশ বস্ত্রপণ্য রপ্তানি করছে। বাকি ৪১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় পণ্য রপ্তানি করছে, যা বিশ্বের ১২৯টি দেশে পৌঁছে যাচ্ছে।
বর্তমানে ইপিজেডে উৎপাদিত বৈচিত্র্যময় পণ্যের তালিকায় রয়েছে তাঁবু ও তাঁবুর সরঞ্জাম, বাইসাইকেল, কসমেটিকস, হলিউড মাস্ক, ক্যাম্পিং ফার্নিচার, গলফ শ্যাফট, উইগ ও ফ্যাশন চুল, ম্যানিকুইন, পাটপণ্য, এনার্জি সেভিং বাল্ব, ধাতব পণ্য, খেলনা, চশমা ও চশমার ফ্রেম, ক্যামেরার লেন্স, মোবাইল যন্ত্রাংশ, কার সিট হিটার, বাঁশের তৈরি কফিন, পিপিই, ফেস মাস্ক, ব্রাইডাল গাউন, গিফট বক্স, আইল্যাশ, কার্টন, পিভিসি অ্যাপ্রোন, সেফটি শু, ব্যাগ, লাগেজ ইত্যাদি।
নতুন বিনিয়োগ চুক্তি করা কোম্পানিগুলো প্রথাগত পোশাক খাতের বাইরে ভিন্নধর্মী পণ্য উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। লিজ চুক্তি সই করা ৭৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও আনুষঙ্গিক পণ্য খাতে রয়েছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৫৪টি প্রতিষ্ঠান বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন করবে।
এই বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ৯২ কোটি ৪১ লাখ ডলার। এসব কারখানায় ড্রোন, ব্লুটুথ হেডফোন, ডেটা কেব্ল, লাগেজ, স্পোর্টসওয়্যার, এলইডি বাল্ব, তামার তার ও শিট, তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রী, কৃষিপণ্য, ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল আইটেম এবং ব্যাটারি প্লেটসের মতো পণ্য তৈরি হবে।
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে বেপজা। এই লক্ষ্যে সংস্থাটি সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বেপজার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শুধু মতবিনিময় করা নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে পারস্পরিক আস্থা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। পাশাপাশি শিল্প পরিচালনার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় যৌথ সমাধান খোঁজা এই মতবিনিময়ের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বেপজার নির্বাহী পরিচালক (জনসংযোগ) এ এস এম আনোয়ার পারভেজ বলেন, “বেপজা বিশ্বাস করে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরাই নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। বেপজার সেবার মান উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে আরও শক্তিশালী করতে বর্তমান বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত শোনা হচ্ছে।”