যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে দেশটির সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। গত মঙ্গলবার এই জয়ের মধ্য দিয়ে এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন ৪২ বছর বয়সী মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন রাজনীতিক। রাজনৈতিক অঙ্গনে আসার আগে তিনি জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দীর্ঘ সময় কর্মরত ছিলেন।
মার্কিন সিনেটের ২৩৭ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে তিনি প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হলেন। ১৭৮৯ সালে সিনেটের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত আল-সাইয়েদের আগে কোনো মুসলিম সদস্য এই উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারেননি। ২০২৬ সালের নভেম্বরের এই নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিনের সেই ধারা ভেঙে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করলেন।
অবসরে যাওয়া ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের শূন্য আসনে জয়লাভ করেছেন আল-সাইয়েদ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এই জয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভক্তি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের প্রশ্নে দলের নেতাদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
মিশিগানের রচেস্টার হিলসে মিসরীয় অভিবাসী বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেন আবদুল আল-সাইয়েদ। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে নিজের পেশাজীবন গড়ে তোলেন। ২০০৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ রোডস স্কলার হিসেবে ২০১১ সালে ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৪ সালে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। উল্লেখ্য, রোডস স্কলারশিপ হলো বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, অভিজাত ও মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কলারশিপ প্রোগ্রাম।
পেশাগত জীবনে ২০১৫ সালে মিশিগানের বৃহত্তম শহর ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন আল-সাইয়েদ। শহরটির আর্থিক সংকটের পর জনস্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের উদ্যোগ তদারকির গুরুদায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রার্থী হলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন তিনি। এরপর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডেট্রয়েট শহর অবস্থিত ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবিক ও প্রবীণ সেবাবিষয়ক বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আল-সাইয়েদ।
রাজনীতিতে উত্থান ও ঐতিহাসিক জয়
২০২৬ সালে পুনরায় নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হন আল-সাইয়েদ। গত আগস্টে মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে তিনি মনোনয়ন পান। তাঁর এই নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন দিয়েছিলেন প্রগতিশীল ধারার প্রভাবশালী কয়েকজন রাজনীতিক, যাঁদের মধ্যে ছিলেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ এবং মিশিগানের প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য রাশিদা তালিব।
সিনেট নির্বাচনের প্রচারে আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ রিপাবলিকান দলের বেশ কয়েকজন নেতা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বারবার সমালোচনা করেন। এর বিপরীতে আল-সাইয়েদ তাঁর প্রচারণায় সবার জন্য মেডিকেয়ার কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো, আবাসন ব্যয় হ্রাস, রাজনীতিতে ধনী দাতাদের প্রভাব কমানো এবং শ্রমজীবী পরিবারের অর্থনৈতিক সুযোগ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিতি পান আল-সাইয়েদ। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে তিনি গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধের আহ্বান জানান। ইসরায়েল নিয়ে তাঁর এই কঠোর অবস্থান নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়।
ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে আল-সাইয়েদের কাছে হেরে যাওয়া হেইলি স্টিভেন্স মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে নিজ দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করেন। আল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারের বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেন। স্টিভেন্সের এই সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাট শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও আল-সাইয়েদের জয়ের পথে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান
নির্বাচনী প্রচারণার সময় আল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান নেতাদের আক্রমণ তীব্র হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন নেতা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বারবার সমালোচনা করেন। এই সমালোচনার জবাবে আল-সাইয়েদ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে দৃষ্টি সরাতেই প্রেসিডেন্ট তাঁর নাম ও ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করছেন।”
সিনেটে আল-সাইয়েদের এই নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তবে এর আগে মুসলিম মার্কিনরা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো করছেন। ২০০৬ সালে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে (প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য) নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে রাশিদা তালিব ও ইলহান ওমর প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন।