কক্সবাজারের টেকনাফে ইয়াবার চালান ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগের জেরে চারজনকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই নৃশংস নির্যাতনের ফলে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকাল ও দুপুরে উপজেলার হোয়াইক্যং এবং হ্নীলা ইউনিয়নের পৃথক পাহাড়ি এলাকা থেকে পুলিশ তাদের মরদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনায় আহত আরও দুই ব্যক্তিকে পুলিশি হেফাজতে রেখে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।

নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের আমতলী এলাকার কালু ফকিরের পুত্র মো. আকবর ওরফে আব্বুইয়া (৩০) এবং একই ইউনিয়নের দৈংগ্যাকাটা এলাকার মৃত আবদু সালামের পুত্র মোক্তার আহমদ (৪৮)। অন্যদিকে, আহত দুই ব্যক্তি হলেন তুলাতলী এলাকার মৃত আমির হোসেনের পুত্র আলী আহমদ (৪০) ও আবুল হোসেনের পুত্র মো. ইলিয়াস (৩৫)।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, বুধবার সকাল ৯টার দিকে পশ্চিম পানখালী বন বিট কার্যালয়সংলগ্ন এলাকা থেকে মোক্তার আহমদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সময়ে আহত অবস্থায় আলী আহমদ ও ইলিয়াসকেও উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে দুপুর সোয়া ১টার দিকে হ্নীলা ইউনিয়নের বড় লেচুয়াপ্রাং পাহাড়ি এলাকা থেকে আকবর ওরফে আব্বুইয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ এবং আহত ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এক লাখ ইয়াবার একটি চালান এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার পথে একটি ডাকাত দল সেটি ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ছিনিয়ে নেওয়া চালানের ৭০ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হলেও বাকি ৩০ হাজার ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এই বিরোধের জেরেই চারজনকে ধরে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়।

আহত ইলিয়াস জানান, মাদকের চালানটি চেকপোস্ট পার করে টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের দৈংগ্যাকাটা পাহাড়ে অন্য একটি দলের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল। পথে ডাকাত দল চালানটি ছিনিয়ে নেয়। পরে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলে হোয়াইক্যংয়ের তুলাতলী এলাকার মিজান তাদের চারজনকে বিচারের কথা বলে সোমবার রাতে হ্নীলার একটি দলের হাতে তুলে দেন। এরপর তাদের পাহাড়ে নিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়। এতে মোক্তার আহমদের মৃত্যু হয়।

ইলিয়াস আরও জানান, “ইয়াবার চালানটির মালিক হ্নীলার একজন মাদক কারবারি।”

নিহত মোক্তার আহমদের শ্যালক মোহাম্মদ ইউনুছ জানান, মঙ্গলবার রাতে মোক্তার বাড়ি ফেরেননি। বুধবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পানখালী এলাকায় তার মরদেহ পড়ে থাকার খবর দেখতে পান তিনি।

পানখালী এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাঈল জানান, বুধবার ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে বাইরে বের হয়ে দেখেন, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে তিনজনকে নামিয়ে সেখানে ফেলে রেখে চলে যাওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, “জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে কারা তাদের অপহরণ করে নির্যাতন করেছে এবং কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা জানা যেতে পারে।” তার অভিযোগ, এলাকায় ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যে মানুষ চাষাবাদ করতে পারছেন না।

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, “ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগে চালানের মালিকপক্ষ চারজনকে মারধর করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের নাম বেরিয়ে আসবে।”

ওসি মো. সাইফুল ইসলাম জানান, দুজনের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহত দুজনকে পুলিশি হেফাজতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে তদন্ত চলছে।

বিষয়টি জানতে চাইলে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি তাদের নজরে এসেছে। ইতিমধ্যে তাদের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। দলটি বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। এ ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”