মাগুরায় আলোচিত ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতি এবং মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক শাকের হোসেনের (৩৬) হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। জানা গেছে, ডাকাতি করা সোনার ভাগাভাগি এবং লেনদেন সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে শাকেরকে হত্যা করা হয়েছে। জেলা পুলিশ এবং গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যৌথ পরিচালনায় পৃথক অভিযানে এই দুই চাঞ্চল্যকর মামলার মূল পরিকল্পনাকারীসহ মোট ৭ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত ও উদ্ধারকৃত সর্বমোট ৬১ ভরি ৬ আনা (৭১৬.৪৬ গ্রাম) স্বর্ণ, দুটি মোটরসাইকেল, একটি প্রাইভেটকার এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুলির আলামত জব্দ করা হয়েছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে মাগুরা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন।

তদন্তে জানা গেছে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে সংঘটিত স্বর্ণ ডাকাতি এবং পরবর্তীতে বাস টার্মিনালে যুবদল নেতা শাকেরকে গুলি করার ঘটনাটি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) খন্দকার খায়রুল হাসানের নির্দেশ ও নেতৃত্বে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।

পুলিশ পরিচয়ে বাসে ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতি
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ বিস্তারিত জানিয়েছে যে, গত ৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মাগুরা সদর থানাধীন রামনগর বাজার এলাকায় ‘গোল্ডেন লাইন’ বাসে পুলিশ পরিচয় দিয়ে উঠে ১২-১৫ জনের একটি দুর্বৃত্ত দল। তারা মানিকগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. মজিবর রহমানকে (৪৮) জোরপূর্বক বাস থেকে নামিয়ে হুলিনগর গ্রামের নিখিল মাস্টারের মেহগনি বাগানে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছে থাকা আনুমানিক ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা মূল্যের ১৫০ ভরি তেজাবী সোনা এবং নগদ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত ২৮ অক্টোবর মাগুরা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার পর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. জুয়েল হোসেন (৪৭), তৌকির আহমেদ (২৫), মো. ফরিদ মণ্ডল (৫৯), মো. মিল্টন মোল্যা (৩৫), মারুফ আকতার (৩২), মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) এবং মো. মারুফ হোসেন (৪৪)। তাদের কাছ থেকে ১টি তেজাবী কাটা সোনার বার (ওজন ৯ ভরি ৭ আনা ৫ রতি), ডাকাতিতে ব্যবহৃত ইয়ামাহা এক্সএসআর ও পালসার মডেলের ২টি মোটরসাইকেল এবং ১টি সিলভার রঙের টয়োটা ভিটস কার জব্দ করা হয়।

স্বর্ণের ভাগ নিয়ে বিরোধে টার্মিনালে শাকেরকে প্রকাশ্যে গুলি
ডাকাতির ঘটনার তদন্ত চলাকালীন গত ২১ অক্টোবর ভোরে মাগুরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ‘রয়েল এক্সপ্রেস’ কাউন্টারে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে করে এসে যুবদল নেতা শাকের হোসেনের মাথায় গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের স্ত্রী শারমিয়াহার রমা বাদী হয়ে মাগুরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ তদন্ত চালিয়ে এই হত্যা মামলায় ৬ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তারা হলেন রনি শিকদার (৩৮), শামীমা তাবাসসুম (৩১), অনিমেষ মজুমদার (৫৫), মো. মারুফ হোসেন (৪৪), মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) এবং বশির আলী (৩৫)। তাদের নিকট থেকে পিস্তলের বুলেট, খালি কার্তুজ এবং ৫১ দশমিক ৯ ভরি (৫টি সোনার বার) সোনা উদ্ধার করা হয়। ফলে দুই মামলা মিলিয়ে সর্বমোট উদ্ধারকৃত সোনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১ ভরি ৬ আনা (৭১৬.৪৬ গ্রাম)।

১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি ও মূল রহস্য
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উভয় মামলার অন্যতম প্রধান আসামি মো. গোলাম জাহিদ (৪৫) মাগুরার বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি সোনা চোরাচালান ও লুণ্ঠিত সোনার ভাগাভাগি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কথা স্বীকার করে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন।

পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, এই অপরাধ চক্রের বাকি সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট সোনা উদ্ধারে পুলিশের অভিযান জোরদার রাখা হয়েছে।