জন্মের পর থেকেই এক চোখ দৃষ্টিহীন, আর অন্য চোখের দৃষ্টিও বেশ ঝাপসা। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দমে যাননি ইনামুল হক। প্রতিদিন ভোরেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এক হাতে সংবাদপত্রের বান্ডিল আর অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে ঘুরে ঘুরে পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন খবরের কাগজ। এভাবেই কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ ৪০টি বছর। এর মধ্যে গত ২৮ বছর ধরে তিনি বিলি করছেন মুক্তকণ্ঠ।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার টাঙ্গন গ্রামের বাসিন্দা ৬২ বছর বয়সী ইনামুল হকের সঙ্গে গত সোমবার ভোরে রাজশাহী নগরের রেলগেটের গৌরহাঙ্গা এলাকায় কথা হয়। তখন তিনি সংবাদপত্র এজেন্টের কাছ থেকে দিনের পত্রিকাগুলো নিচ্ছিলেন। এরপরই সাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা বিলির কাজ শুরু করবেন তিনি। রোদ, বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীত—কোনো প্রতিকূলতাই তাঁকে এই কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি।

এক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করতেন ইনামুল হক। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই সংখ্যা কমে এখন দাঁড়িয়েছে ১৬০টিতে। এর মধ্যে মুক্তকণ্ঠ বিক্রি করেন ৪০ থেকে ৪৫ কপি। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

চার দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় ইনামুল হক অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছেন। এই সময়ে তিনি লক্ষ্য করেছেন পাঠকের অভ্যাসের পরিবর্তন, বদলে গেছে সংবাদপত্রের বাজার এবং বিক্রির পরিমাণ। ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের সহজলভ্যতার কারণে বর্তমান সময়ে অনেকেই অনলাইনে খবর পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তা সত্ত্বেও হাতে হাতে ছাপা পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার পুরনো অভ্যাস ছাড়েননি ইনামুল হক।

নিজের চোখের সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি ছাপা পত্রিকা পড়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। ইনামুল হকের আক্ষেপ, বর্তমান সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকেই আর পত্রিকা পড়েন না। বই পড়ার অভ্যাসও তাদের মধ্যে তেমন নেই; সবাই মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে তরুণদের মুঠোফোন ছেড়ে নিয়মিত পত্রিকা পড়ার পরামর্শ দেন তিনি।

নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই কেটেছে ইনামুলের জীবন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা পুনরায় বিয়ে করলে সৎমায়ের সংসারে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। মূলত দাদির কাছেই তিনি বড় হয়েছেন। দাদি নিজের খাবার থেকে আলাদা করে তাঁর জন্য খাবার রাখতেন এবং সেই ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছেন তিনি।

ইনামুল হকের পড়াশোনার শুরু রাজশাহীতে। পরবর্তীতে চাচার চাকরির সূত্রে বিভিন্ন জেলায় পড়াশোনা করেন তিনি। চাচার বদলির কারণে পুনরায় রাজশাহীতে ফিরে এসে কাটাখালী স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁর এক চাচাতো ভাই সাংবাদিকতা করতেন। তাঁরই পরামর্শে আশির দশকে অল্প কয়েকটি পত্রিকা নিয়ে বিক্রি শুরু করেন ইনামুল। পরবর্তীতে বিভিন্ন এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়ান। ইনামুল বলেন, ‘তখন পত্রিকা বিক্রির পাশাপাশি জমিতে ধান কাটার কাজও করতাম।’

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার কিছুই ছিল না। দাদির কাছে মানুষ হয়েছি। এই পত্রিকা বিক্রি করেই তিন সন্তানকে মানুষ করেছি। পাঁচ কাঠা জমি কিনেছি; বাড়ি করেছি। এটাই আমার সম্বল।”

প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন ইনামুল। তবে পাঁচ বছর আগে অসুস্থতার কারণে তাঁর স্ত্রী মারা যান। তাঁদের তিন সন্তান। বড় মেয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেছেন এবং তাঁর পাঁচ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। ছেলে নিউ ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা দিয়েছেন এবং ছোট মেয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন।

ইনামুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমার কিছুই ছিল না। দাদির কাছে মানুষ হয়েছি। এই পত্রিকা বিক্রি করেই তিন সন্তানকে মানুষ করেছি। পাঁচ কাঠা জমি কিনেছি; বাড়ি করেছি। এটাই আমার সম্বল।”

পত্রিকা বিলি করতে রাজশাহীর মটপুকুর থেকে ছোট বটতলা, বড় বটতলা, তালাইমারী, কাজলা, বিনোদপুর, মির্জাপুর, ভদ্রা ও কাটাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ান তিনি। এছাড়া রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। সাইকেল চালিয়েই তিনি এই কাজ করেন, যদিও দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর চারটি সাইকেল চুরি হয়েছে।

এক সময় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করলেও এখন তা ১৬০টিতে নেমে এসেছে, যার মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ কপি মুক্তকণ্ঠ। এই দীর্ঘ সময়ে বহু মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। পুরোনো পাঠকদের সঙ্গে দেখা হলে তাঁরা অবাক হয়ে যান এবং জানতে চান এত বছর পর কেন তিনি একই কাজ করছেন। এসব কথায় তিনি কখনো আবেগাপ্লুত হন, আবার কখনো নিজের কাজের প্রতি গর্ব অনুভব করেন।

রাজশাহী মহানগর সংবাদপত্র শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রাজশাহীতে যত হকার আছেন, তাঁদের পুরোনো কয়েকজনের একজন ইনামুল। তিনি সেই চারঘাট থেকে এসে পত্রিকা বিলি করেন। তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠককে এ সেবা দিয়ে আসছেন।”

তবে কাজের ক্ষেত্রে কিছু বিরক্তিও তাঁকে স্পর্শ করে। গাড়ি থেকে পত্রিকা আসতে দেরি হলে পাঠকেরা বিরক্ত হন, যা তাঁকে কষ্ট দেয়। আবার পত্রিকার সংখ্যা কমে গেলেও মন খারাপ হয় তাঁর। ইনামুল বলেন, “গাড়ি দেরি করলে আমাদের পত্রিকা দিতে দেরি হয়। তখন অনেকে রাগ করেন। আবার দুই কপি পত্রিকা কমে গেলেও খারাপ লাগে, একটা বাড়লে ভালো লাগে।”

ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। তাঁর অভিজ্ঞতায়, মাঝখানে বিক্রি অনেক কমে গেলেও এখন তা কিছুটা বাড়ছে। তবে মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। ইনামুল জানান, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার পেছনে মুঠোফোনের আসক্তি একটি বড় কারণ। এমনকি এবার পরীক্ষায় পাসের হার কমার পেছনেও মুঠোফোনের ব্যবহার ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।

ইনামুলের ভাষ্যমতে, ছাপা পত্রিকায় শিক্ষার্থীদের উপযোগী অনেক শিক্ষামূলক বিষয় প্রকাশিত হয়। অষ্টম, নবম, দশম ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এসব পড়ে অনেক উপকৃত হতে পারে। তাই মুঠোফোনের পাশাপাশি বই ও পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।