অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক এবং শিক্ষক—এই সবকটি পরিচয়ের এক অনন্য সমন্বয় ছিলেন ইনামুল হক। মঞ্চ ও টেলিভিশনের অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নাটক লিখেছেন এবং নাট্যদল গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘ ৪৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনেও তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। আজ সেই গুণী শিল্পীর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী।
শারীরিক অবস্থার কথা বলতে গেলে, সামান্য পিঠের ব্যথা ছাড়া তিনি তেমন কোনো অসুস্থতায় ভুগছিলেন না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাসাতেই সময় কাটাচ্ছিলেন তিনি। তবে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর দুপুরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন অভিনেতা, নাট্যকার ও নির্দেশক ইনামুল হক। বেইলি রোডের বাসায় চেয়ারে বিশ্রাম নেওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ৭৮ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছিল গভীর শোক।
পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলেও বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে তাঁর অভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। অভিনয়, নাট্য রচনা ও নির্দেশনার পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবেও তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন, তা অনস্বীকার্য। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ এবং পেশাগত জীবনের দায়িত্ববোধ—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তাঁর পথচলা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
শৈশব ও বেড়ে ওঠা
১৯৪৩ সালের ২৯ মে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন ইনামুল হক। তাঁর পিতার নাম ওবায়দুল হক এবং মাতার নাম রাজিয়া খাতুন। মাত্র সাত বছর বয়সে মাকে হারানোর পর ফুফুর তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। ফুফা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁর চাকরির সূত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের বসবাস করতে হয়েছে। নতুন নতুন জায়গায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। তবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলে যাওয়ার সময় প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে আসতে হতো বলে তিনি খুব মন খারাপ করতেন।
ফেনী পাইলট হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে তিনি ঢাকায় নটর ডেম কলেজে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার ব্যস্ততার মাঝেও নাটক-অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ কখনো ম্লান হয়নি।
কলেজে প্রথম অভিনয়
নটর ডেম কলেজে পড়ার সময়ই তাঁর মঞ্চ অভিনয়ের সূচনা হয়। ফাদার গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ডাকসুর হয়ে নিয়মিত মঞ্চনাটকে অভিনয় করতেন। এভাবেই অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। ১৯৬৮ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন ইনামুল হক। তিনি ছিলেন দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এই দলের হয়ে আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। পরবর্তীতে ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ ও ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’-এর মতো উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটকেও তাঁর অভিনয় দেখা গেছে।
১৯৯৫ সালে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় ছেড়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাগরিক নাট্যাঙ্গন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত দলটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মঞ্চনাটকের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এবং নতুন নাট্যচর্চার জন্য দল গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁকে নাট্যাঙ্গনে এক স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছিল।
নাটক লেখা ও টেলিভিশনে অভিনয়
অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক লেখার প্রতিও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। ১৯৬৮ সালে তাঁর লেখা ‘অনেকদিনের একদিন’ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়। টেলিভিশনের জন্য তিনি প্রায় ৬০টি নাটক লিখেছেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘সেইসব দিনগুলি’, ‘নির্জন সৈকতে’ ও ‘কে বা আপন কে বা পর’। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত ‘সেইসব দিনগুলি’ তাঁর নাট্যরচনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ।
মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন ইনামুল হক। বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নাট্যকার হিসেবে গল্প নির্মাণ, অভিনেতা হিসেবে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা এবং নির্দেশক হিসেবে মঞ্চের কাজ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়।
শিক্ষকতার দীর্ঘ জীবন
অভিনয় ও নাট্যচর্চার পাশাপাশি পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শিক্ষাবিদ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘ ৪৩ বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৫ বছর এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন ছিলেন দুই বছর। ২০০৮ সালে অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। বিজ্ঞান ও শিল্প—এই দুই ভিন্ন জগতের সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি নিজের আগ্রহ ও দায়িত্বের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেছেন, অন্যদিকে মঞ্চ ও টেলিভিশনের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর জীবন তাই শুধু একজন অভিনেতার জীবন নয়; বরং একই সঙ্গে একজন শিক্ষক, নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠকের জীবন।
পরিবারেও নাটকের আবহ
ইনামুল হকের পরিবারও নাট্যজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাঁর স্ত্রী লাকী ইনাম একজন অভিনেত্রী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। তাঁদের দুই মেয়ে হৃদি হক ও প্রৈতি হক। হৃদি হক অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনা ও নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত। তাঁদের দুই জামাতা অভিনেতা লিটু আনাম ও সাজু খাদেম। পরিবারের একাধিক সদস্যের শিল্পচর্চার ফলে ঘরেই নাটকের এক অনন্য আবহ ছিল।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
শিল্প-সংস্কৃতি ও নাট্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১২ সালে একুশে পদক পান ইনামুল হক। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কারেও ভূষিত করা হয়। তাঁর কাজের স্বীকৃতি শুধু পুরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নাট্যচর্চা, অভিনয়, নাটক লেখা এবং শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণে একটি কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। আজ পাঁচ বছর পরও তাঁর অভিনয়, নাট্য রচনা ও সাংগঠনিক কাজের স্মৃতি তাঁকে মনে করিয়ে দেয়। মঞ্চের আলো থেকে শ্রেণিকক্ষ—বিভিন্ন পরিসরে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই মানুষটির শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।