কিছু মানুষ হরিয়াল রঙের। কেউবা কচুরিপানা ফুল রঙের। আবার কেউ গহিন জলরঙের কিংবা নিষ্ফলা মাটি রঙের। বনিজুল তার জীবনে এমন আরও কত রঙের মানুষ দেখেছে যে তার ইয়ত্তা নেই।
গিলা-কলিজা নামের মানুষটি কী রঙের ছিল? সে ছিল মহিষ রঙের। তবে এই গিলা-কলিজাকে শেষ পর্যন্ত সাইজ করেছে ডাকাইত। গিলা-কলিজার আসল নাম মহসিন এবং ডাকাইতের আসল পরিচয় মতলবের হামেদ। মহসিনের নাম কীভাবে গিলা-কলিজা হয়ে গেল, সেই ইতিহাস শোনে নাই বনিজুল। লোকাল আন্ডারগ্রাউন্ডের এ রকম অসংখ্য ইতিহাস সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটা বিরাট আফসোসের ব্যাপার। মতলবের হামেদ দিনেদুপুরে প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে মানুষ খুন করে ডাকাইতের মতো। এই হলো ডাকাইত নামের ইতিহাস। অন্যদিকে, বেকুব গিলা-কলিজা কত বড় বেকুব ছিল যে, সে ফোন দিয়ে বসেছিল খোদ এ টি এম আবেদ মনসুরের পারসোনাল নাম্বারে। শুধু এই অপরাধেই এ টি এম আবেদ মনসুর তাকে হত্যার নির্দেশ জারি করতে পারতেন। গিলা-কলিজা পঞ্চাশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে শাসিয়েছে এ টি এম আবেদ মনসুরকে। হুমকি দিয়েছিল যে, চাঁদা না দিলে মব করে এ টি এম আবেদ মনসুরের সিরামিক কারখানা ধ্বংস করে দেবে।
শীর্ষ শিল্পপতি এ টি এম আবেদ মনসুর। চাঁদাবাজি, থ্রেট নিয়ে ডিল করে এমন এজেন্সি আছে। তারা গিলা-কলিজাবিষয়ক যাবতীয় তথ্য ফরোয়ার্ড করেছে এ টি এম আবেদ মনসুরকে। এ টি এম আবেদ মনসুর ফরোয়ার্ড করেছেন তাঁর সিকিউরিটি চিফ ইসফানদিয়োরকে। ইসফানদিয়োর গিলা-কলিজাকে সরাসরি কল দিয়েছিল, “তুই কি গিলা-কলিজা?”
তুই করে বলে! গিলা-কলিজা চেঁচিয়ে উঠেছিল, “তুই ক্যাঠা?”
ইসফানদিয়োর গলা চড়ায় নাই, “তোর জ্যাঠা।”
“ক্যাঠা?”
“হান্না সিরামিক গুড়াই দিবি তুই?”
“তুই কে মামদার পো?”
“চান্দা কত চাইছিস? পঞ্চাশ লাখ টাকা?”
“তুই কে? তোর মায়রে বাপ!”
“তোর কল্লার দাম কত গিলা-কলিজা?”
এই খুনের দরপত্র জমা দিয়েছিল দুইজন। ক্ষুর মকিম চেয়েছিল ৫০, আর জুনিয়র আক্কু চেয়েছিল ৪০। ডাকাইত হামেদ নিজে থেকে কানেক্ট করেছিল ইসফানদিয়োরকে। গিলা-কলিজার সঙ্গে তার কিছু প্রাইভেট বোঝাপড়া ছিল। মূল্য হ্রাস করে ডাকাইত গিলা-কলিজার জান ‘কন্টেক’ নিয়েছিল ২০–এ। ইসফানদিয়োরের পক্ষে আবু মুসা অগ্রিম ২০ বুঝিয়ে দিয়েছিল ডাকাইতকে। আন্ডারগ্রাউন্ড জগৎ বিশ্বাসের জগৎ।
নর্দ্দা বাজারে চক্রব্যূহ তৈরি করে রেখেছিল ডাকাইত। গিলা-কলিজা সেই চক্রব্যূহ ভেদ করে দৌড় দিয়েছিল। মানুষ কুপিয়ে এত আনন্দ ডাকাইত বহুদিন পায় নাই। শীর্ষ শিল্পপতি এ টি এম আবেদ মনসুর। চাঁদাবাজি, থ্রেট নিয়ে ডিল করে এমন এজেন্সি আছে। তারা গিলা-কলিজাবিষয়ক যাবতীয় তথ্য ফরোয়ার্ড করেছে এ টি এম আবেদ মনসুরকে। এ টি এম আবেদ মনসুর ফরোয়ার্ড করেছেন তাঁর সিকিউরিটি চিফ ইসফানদিয়োরকে। ইসফানদিয়োর গিলা-কলিজাকে সরাসরি কল দিয়েছিল, “তুই কি গিলা-কলিজা?”
সেই দুপুরে বাতেন মামা বনিজুলকে নর্দ্দা বাজারে থাকতে বলেছিলেন। রহস্যমানব বাতেন মামা কি জানতেন যে সেখানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে? চোখের সামনে সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখে ঘোরে পড়ে গিয়েছিল বনিজুল। মানুষের রক্ত এ রকম মাদার ফুলের মতো লাল রঙের হয় নাকি? পলায়ন–তত্পর রক্তাক্ত গিলা-কলিজা প্রকাশ মহসিনকে কেমন ফুলভরা মাদারগাছ মনে হচ্ছিল। সে ছুটে যাচ্ছিল। কেন এমন মনে হয়েছিল, বনিজুল ভেবে পায় নাই। নিম্মি কামরাঙ্গীরচরে জন্মেছে, জন্মে স্বচক্ষে মাদারগাছ বা ফুল দেখে নাই, সেই নিম্মিকে কথাটা বলেছিল বনিজুল। নিম্মির টানা টানা চোখ দুটা বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠেছিল, “ক্যাড়া আছে আপনের মাথায়।”
বাতেন মামার মুরিদ উইলিস এবং নির্বাণ প্রকাশনার ম্যানেজার গোল হাসানও একই রিভিউ দিয়েছে। “ক্যাড়া” আছে বনিজুলের মাথায়। নির্বাণ প্রকাশনার অফিস বাংলাবাজারে। সপ্তাহে তিন দিন যায় বনিজুল। সেখানে সে বই সম্পাদনার কাজ করে দেয়। গোলাকৃতির গোল হাসানের সঙ্গে তার সম্পর্ক রঙ্গরসিকতার। উইলিস তেমন নয়, সে বেশ কঠিন পাল্লা। তবে ব্যাপার নেই, তার মাথায় ক্যাড়া আছে এটা বনিজুল নিজেও জানে। বাতেন মামাও চিন্তা করতে পারবেন না, এমন কিছু ঘটিয়ে দিতে পারে সে।
বাতেন মামা ঝাউগাছ রঙের। গোল হাসান শিয়াল রঙের। আর নিম্মি কলাবতী ফুল রঙের। কামরাঙ্গীরচরে জন্মেছে নিম্মি, সেখানে কলাবতী ফুলও দেখে নাই সে। বনিজুলের কথার তল সে পায় না, “এই সব কী কথা বলেন আপনে! মানুষ আবার কেমনে ফুলের রঙের হয়? সেই ফুলের নাম আবার কলাবতী।”
বনিজুল নিম্মিকে বোঝাতে যায় নাই যে সে মানুষের রং এভাবে দেখে। নিম্মি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে আর পড়ে নাই। বনিজুলের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার কথা ছিল না। নাকি পৃথিবীতে কার সঙ্গে কার দেখা হবে—সেটা আগে থেকে নির্দিষ্ট থাকে? সেই হিসাবমতো তাদের দেখা হয়েছে এবং একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তবে তা প্রেমমূলক কিছু নয়। বনিজুলকে পে করতে হয়। পাঁচ শ টাকা নিম্মি পায়, এক হাজার টাকা খালা রেখে দেয়। খালার আন্ডারে আরও কিছু মেয়ে আছে—নীলুফার, সুরাইয়া, পপি, আইরিন। নীলুফার দাঁড়কাকিনী রঙের। আইরিন আতাফল রঙের।
‘রইদ’ সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। বনিজুল তা দেখবে। নিম্মিও দেখবে যদি খালা তাকে বনিজুলের সঙ্গে যেতে দেয়। কামরাঙ্গীরচরে জন্মেছে নিম্মি, কলাবতী ফুলও দেখে নাই সে। বনিজুলের কথার তল সে পায় না, “এই সব কী কথা বলেন আপনে! মানুষ আবার কেমনে ফুলের রঙের হয়? সেই ফুলের নাম আবার কলাবতী।”
খালা শীতকালের শুশুক রঙের। বনিজুল খালাকে বলল। আজব। খালা ডিমান্ড দিল পাঁচ হাজার টাকা সিকিউরিটি মানি হিসেবে তার কাছে জমা রাখতে হবে। কারণ বনিজুল যদি নিম্মিকে নিয়ে পালায়! যদি না পালায় এবং ফেরত আসে, তবে সিকিউরিটি মানির তিন হাজার টাকা খালা রিটার্ন দিয়ে দেবে বনিজুলকে। খালার জবান। বনিজুল না হয়ে আর কেউ হলে সিকিউরিটি মানি হিসেবে খালা কমপক্ষে পনেরো হাজার টাকা রাখত। খালার এই বদান্যতা গ্রহণ করল বনিজুল। সিকিউরিটি মানি হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা জমা রাখল সে। নিম্মি বোরখা পরে বনিজুলের সঙ্গে অটোতে উঠে সামান্য আড়ষ্ট হয়ে থাকল।
স্টার সিনেপ্লেক্সে ‘রইদ’ দেখতে ঢুকল তারা। দশ মিনিটে ‘রইদ’-এ ডুবে গেল বনিজুল। কিন্তু নিম্মি? এই মেয়েকে নিয়ে সিনেমা দেখার শখ হলো কেন বনিজুলের? সে কি আদৌ সিনেমা দেখে? কী ধরনের সিনেমা দেখে—হিন্দি সিনেমা নাকি তামিল সিনেমা? হাফটাইমে বনিজুল পপকর্ন কিনল।
“কফি আনব?”
“নাহ!”
“ছবি কেমন লাগতেছে?”
“পাগলিরে ভালো লাগতেছে।”
“সাধুরে ভালো লাগতেছে না?”
“সাধু কি আপনের মতো?”
“তুমি কি পাগলির মতো?”
আলো নিভে গেল থিয়েটারের। আবার ‘রইদ’ উঠল পর্দায়। বনিজুল আবার ডুবল। সে ‘সাধু’ না, নিম্মিও ‘পাগলি’ না। তবে সে নিজেকে পর্দার সাধুর স্থলাভিষিক্ত করতে পারল।
ঠিক তখনই ফোন কম্প দিল। বাতেন মামা কলিং। বাতেন মামা! কেন?
বনিজুল ফোন ধরল, “জি মামা?”
“নিম্মিরে নিয়া সিনেমা দেখতেছ মামা?”
বাতেন মামা রহস্যমানব। সব খবর কীভাবে যে তার কানে পৌঁছে যায়!
বাতেন মামা মেসে থাকেন। ফকিরেরপুলের বিখ্যাত হাজী বকশের মেসে। তিনতলায়। রুম নাম্বার ৪৭। রুমে বোর্ডার আছে আর তিনজন। তারা মুরব্বি মানে বাতেন মামাকে।
বনিজুল বলল, “জি মামা।”
বাতেন মামা বললেন, “নিম্মি কি সিনেমা দেখতেছে?”
“দেখতেছে মামা।”
“দেখতেছে না। যা বলি মামা মন দিয়া শোনো। নিম্মি সিনেমা দেখতেছে না, কসাই মসি দশ মিনিট আগে খুন করে রেখে গেছে নিম্মিরে। চেক করে দেখার দরকার নাই তোমার। দেরি করলে পুলিশি ঝামেলায় পড়বা। ছবির শেষ অংশ পরে দেখে নিয়ো। এখন উঠে পড়ো। হল থেকে বাইর হও। মার্কেটের গেইটে অটো পাইবা। লতিফের অটোতে উঠবা।”
“লতিফের অটো?”
“সে তোমারে ডাক দিব। নিজের পরিচয় নিজে দিব। হইল? রাখি।”
“মামা...”
“সময় নাই মামা। হল থেকে বাইর হও।”
“আমি হলে নাই মামা।” বনিজুল বলল।
“কী!”
দিনে বাতেন মামা রুমে থাকলে ৪৭ নাম্বার রুমের দরজা হাটখোলা থাকে। বাতেন মামা তার কাঠের চেয়ারে পা উঠিয়ে বসে থাকেন। মুরিদগণের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন—বিশ্রম্ভালাপ মুডে। আর কোনো বোর্ডার রুমে নাই এখন। বনিজুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে হাটখোলা দরজায় স্বয়ং বনিজুলকে দেখলেন বাতেন মামা। বিস্মিত হলেন না। বনিজুলের হাতে ফোন নাই। রুমে ঢুকে বনিজুল একটা চেয়ারে বসল। কোনো রকম ভণিতা না করে বলল, “নিম্মি? কেন মামা?”
বাতেন মামা অস্পষ্ট হাসলেন, “পৃথিবীর সব খুন ধারাবাহিক মামা। মনে করো চীনের কুনমিংয়ে চেরি লি মার্ডার হইল, সেই ধারাবাহিকতায় আইভরি কোস্টের নোলু টেট মার্ডারের ঘটনা ঘটবেই। আবার নোলু টেট মার্ডারের ধারাবাহিকতায় হাঙ্গেরির মেগারপোস্টে মোনা গোলাবেক মার্ডার হবেই।”
“ডোমিনো এফেক্টের মতো?”
“ডোমিনো এফেক্টের মতো। আট শ ত্রিশ কোটি ডোমিনো। কোনখানে কে টোকা দিছে একটায়। আট শ ত্রিশ কোটি ডোমিনো পড়ে যাবে, গন্ডগোল করে দিলা তুমি!”
“সরি মামা। কিন্তু নিম্মি এই পৃথিবীতে থাকুক।”
“তুমি তারে নিয়া থাকবা?”
“না।”
“মেয়েটা কলাবতী ফুল রঙের।”
“সে তার যত দিন আয়ু তত দিন থাকুক, মামা।”
“থাকল তো। কলাবতী ফুল রঙের মেয়ে। তুমি কি রঙের মামা?”
বনিজুল হাসল, বাতেন মামার চোখে চোখ রেখে হাসল। রহস্যমানব বাতেন মামা, রহস্য কি ধরতে পারলেন, বনিজুল বলল, “প্রজাপতি আমার রং দেখতে পায়।”