যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের অন্যতম ব্যস্ত এবং জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ‘জোন্স বিচ’। প্রতিবছর কোটি কোটি দর্শনার্থী এই সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেন। তবে এই সৈকতের নামকরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার ইতিহাস অনেকেরই অজানা। যার নামে এই সৈকতের নামকরণ করা হয়েছে, সেই টমাস জোন্স আদতে ১৭ শতকের এক দুর্ধর্ষ জলদস্যুর সহযোগী ছিলেন। সম্প্রতি মার্কিন শখের ইতিহাসবিদ জেমস বেইলির এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
পাঁচ বছর আগে কুখ্যাত ইংরেজ জলদস্যু ক্যাপ্টেন হেনরি এভরির ব্যবহৃত প্রাচীন মুদ্রা খুঁজে পেয়ে ইতিহাসপ্রেমীদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন বেইলি। সম্প্রতি তৎকালীন ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন দলিল ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ঘেঁটে তিনি দাবি করেছেন যে, হেনরি এভরি ও তাঁর দুর্ধর্ষ জলদস্যু দলকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সাহায্য করেছিলেন এই টমাস জোন্স।
ইতিহাসের পাতায় ১৬৯৫ সালে লোহিত সাগরে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজকীয় জাহাজ ‘গঞ্জ-ই-সাওয়াই’-এ এক ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ঘটে, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন এভরি। সেই সময় জাহাজের যাত্রী ও নাবিকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনা চালানো হয়। জলদস্যুরা ওই জাহাজ থেকে কোটি কোটি ডলার মূল্যের সোনা-রুপা লুট করে নিয়ে যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই ছিল জলদস্যুতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডাকাতির ঘটনা। এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো কোনো অপরাধীকে ধরার জন্য সর্বাত্মক অভিযান শুরু হয়। অভিযানের মুখে কিছু জলদস্যু ধরা পড়লেও ক্যাপ্টেন এভরি ও তাঁর প্রধান সহযোগীরা চিরতরে আত্মগোপনে চলে যান।
ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা গেছে, বিপুল সম্পদসহ পালিয়ে যাওয়ার সময় টমাস জোন্স তাঁদের পথনির্দেশক হিসেবে সাহায্য করেছিলেন। এই সহযোগিতার বিনিময়ে ১৭ শতকের শেষের দিকে জোন্স নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে বিপুল সম্পত্তির মালিক হন এবং তিমি শিকারের ব্যবসায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৬৯৮ সালে নিউইয়র্কের গভর্নর এক তদন্ত প্রতিবেদনে জোন্সকে ‘সাবেক দস্যু’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর বাড়িতে গোপন দস্যুতার অর্থ থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে জোন্স ইংরেজ সেনাবাহিনীর একজন মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
টমাস জোন্সের নামানুসারে প্রতিষ্ঠিত এই সৈকত বর্তমানে নিউইয়র্কের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হলেও, নতুন এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ঔপনিবেশিক অর্থনীতি ও অভিজাত শ্রেণির গড়ে ওঠার পেছনে জলদস্যুতার প্রত্যক্ষ ভূমিকার এক ঐতিহাসিক দিক উন্মোচিত করেছে।
‘জোন্স বিচ: অ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি’ বইয়ের লেখক জন হ্যাঙ্ক বলেন, “জোন্সের বিতর্কিত অতীতের যে অংশটি এত দিন স্থানীয় ইতিহাসের বইগুলোতে কেবল ইঙ্গিতে বলা হতো কিন্তু বিশদভাবে উঠে আসেনি, বেইলির এই গবেষণা সেটির ওপরই নতুন করে আলোকপাত করেছে।”