মাঠে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষের পর হাসপাতালে মারা গেছেন স্প্যানিশ ফুটবলার জেসুস দে মিগুয়েল। মাত্র ৩০ বছর বয়সী এই ফুটবলারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে স্পেনের ফুটবলে। এবার সেই মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে দেশটির পুলিশ। বিষয়টি ইতোমধ্যে আদালতের তত্ত্বাবধানেও নেওয়া হয়েছে। তবে তদন্ত শুরু হলেও এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্পেনের জাতীয় পুলিশ টেনেরিফে ক্লাবের ফরোয়ার্ড মিগুয়েলের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্প্যানিশ বার্তা সংস্থা ইএফই জানিয়েছে, দেশটির জাতীয় পুলিশের হোমিসাইড বিভাগ তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে। আদালতের তত্ত্বাবধানে ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখবেন তদন্তকারীরা।
সোমবার (২ নভেম্বর) স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের লিগে এফসি আন্দোরার বিপক্ষে খেলছিল টেনেরিফে। নিজেদের মাঠ হেলিওদোরো রদ্রিগেজ লোপেজ স্টেডিয়ামে ম্যাচটি তখন ২-২ গোলে সমতায়। যোগ করা সময়ের শেষ দিকে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক জেসুস ওওনোর সঙ্গে সংঘর্ষ হয় মিগুয়েলের। গুরুতর আঘাত পেয়ে মাঠেই জ্ঞান হারান তিনি।
ঘটনাটি ঘটে মাঠের মাঝামাঝি এলাকায় বল দখলের লড়াইয়ে। রক্ষণভাগের পেছনে পাঠানো লম্বা একটি বলের দিকে ছুটছিলেন মিগুয়েল। একই সময় নিজের পেনাল্টি বক্স ছেড়ে বল বিপদমুক্ত করতে এগিয়ে আসেন আন্দোরার গোলরক্ষক ওওনো। বলটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দুজন। এ সময় গোলরক্ষকের হাঁটুর আঘাত লাগে মিগুয়েলের বুকে।
সংঘর্ষের পর প্রথমে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন টেনেরিফের ফরোয়ার্ড। কিছুক্ষণ পর মাটিতে লুটিয়ে পড়লে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন সতীর্থরা। দ্রুত মাঠে প্রবেশ করেন চিকিৎসকেরা। প্রাথমিক চিকিৎসার পর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের পর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মিগুয়েলের। অ্যাম্বুলেন্সে জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে তার হৃদ্স্পন্দন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। পরে সান্তা ক্রুস দে টেনেরিফের নুয়েস্ত্রা সেনোরা দে লা কান্দেলারিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয় তাকে।
শুরুতে তার অবস্থা গুরুতর হলেও স্থিতিশীল বলে জানিয়েছিল টেনেরিফে। তবে মঙ্গলবার ভোরে ক্লাবটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিগুয়েলের স্নায়বিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। এরপর স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে টেনেরিফে। যদিও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় আন্দোরার গোলরক্ষক ওওনোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। তবে মিগুয়েলের গুরুতর অবস্থার কারণে ম্যাচটি আর শুরু করা সম্ভব হয়নি। দুই দলের অধিনায়ক ও কোচদের সঙ্গে আলোচনা করে খেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত জানান রেফারি। তখন ম্যাচের স্কোর ছিল ২-২।
ফুটবলারের মৃত্যুর পর তদন্ত শুরু হলেও গোলরক্ষক ওওনোর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। স্পেনের আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনাসহ অস্বাভাবিক কারণে কারও মৃত্যু হলে বিচারিক তদন্ত শুরু করার বিধান রয়েছে। ফলে হোমিসাইড বিভাগের তদন্তের অর্থ এই নয় যে ঘটনাটিকে ইতোমধ্যে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকেও বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, স্বাভাবিক নয় এমন যেকোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রে তদন্ত শুরু করা নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
অন্যদিকে টেনেরিফের প্রধান কৌঁসুলি হোসে লুইস সানচেজ-হাউরেগি জানিয়েছেন, ঘটনাটি খেলার স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সংঘটিত হওয়ায় ফৌজদারি মামলা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হবে।
মিগুয়েলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে টেনেরিফে। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ক্লাবটি জানিয়েছে, “এমন শোকের মুহূর্তে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা নেই।” ফুটবলারের পরিবার ও স্বজনদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তারা। একই সঙ্গে পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
এই ঘটনায় শোক জানিয়েছে প্রতিপক্ষ আন্দোরাও। ক্লাবটির অন্যতম মালিক ও বার্সেলোনার সাবেক ডিফেন্ডার জেরার্দ পিকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিগুয়েলের মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর গোলরক্ষক ওওনোও মাঠে মিগুয়েলের অবস্থা জানতে এগিয়ে এসেছিলেন।
স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ) মিগুয়েলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঙ্গলবারের কোপা দেল রে ও কোপা দে লা রেইনার নির্ধারিত ম্যাচগুলো স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে জাপানের বিপক্ষে স্পেন অনূর্ধ্ব-২১ দলের ম্যাচের একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানও বাতিল করা হয়েছে। স্থগিত ম্যাচগুলোর নতুন সূচি পরে জানানো হবে।
শোক প্রকাশ করেছেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো তারকারাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিগুয়েলের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তারা। রিয়াল মাদ্রিদের ফুটবলাররাও অনুশীলনের আগে এক মিনিট নীরবতা পালন করেছেন। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে নিজেদের ম্যাচগুলোতে নীরবতা পালনের ঘোষণা দিয়েছে উয়েফা।
এদিকে মিগুয়েলের মৃত্যুতে বুধবার (৪ নভেম্বর) টেনেরিফে দ্বীপে এক দিনের সরকারি শোক পালনের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এদিন সরকারি ভবনগুলোতে পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় নীরবতা পালনের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
টেনেরিফের পক্ষ থেকে আগামী শনিবার নিজেদের স্টেডিয়ামে মিগুয়েলকে শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন করা হয়েছে। অন্যদিকে পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী তার মরদেহ স্পেনের তোলোদো প্রদেশের নাভাহেরমোসায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
২০১৫ সালে লেগানেসের দ্বিতীয় দলের হয়ে সিনিয়র ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন মিগুয়েল। এরপর স্পেনের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। গত বছর কাস্তেয়ন ছেড়ে টেনেরিফেতে যোগ দেন এই ফরোয়ার্ড। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকের মধ্যে পড়েছে ক্লাবটির খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকেরা।