খেলার শেষ মুহূর্তের এক ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারালেন স্প্যানিশ ফুটবলার জেসুস দে মিগুয়েল। প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে মাঠেই জ্ঞান হারান তিনি। দ্রুত চিকিৎসকদের সহায়তায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেননি চিকিৎসকেরা।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব টেনেরিফের এই ফরোয়ার্ড। তার বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর।

সোমবার (২ নভেম্বর) স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগ সেগুন্দা ডিভিশনে এফসি আন্দোরার বিপক্ষে এক ম্যাচে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। টেনেরিফের ঘরের মাঠ হেলিওদোরো রদ্রিগেজ লোপেজ স্টেডিয়ামে তখন দুই দলের লড়াই ২-২ সমতায় দাঁড়িয়ে। যোগ করা সময়ের সপ্তম মিনিটে আন্দোরার গোলরক্ষক জেসুস ওওনোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে মাঠের বুকে লুটিয়ে পড়েন মিগুয়েল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে ম্যাচটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।

ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বজায় রেখেছিল টেনেরিফে। প্রথমার্ধেই স্বাগতিকরা দুটি গোল করে এগিয়ে যায়। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় আন্দোরা। ৮৩ ও ৮৮ মিনিটে গোল করে সমতা ফেরায় সফরকারীরা। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর রেফারি আট মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করেন। আর সেই সময়ের মধ্যেই ঘটে যায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।

আন্দোরার রক্ষণভাগের পেছনে ফাঁকা জায়গায় পাঠানো একটি লম্বা বলের দিকে দ্রুত ছুটছিলেন মিগুয়েল। বিপদ বুঝতে পেরে নিজের বক্স ছেড়ে অনেকটা সামনে এগিয়ে আসেন গোলরক্ষক ওওনো। বলটি ক্লিয়ার করার প্রচেষ্টায় লাফিয়ে ওঠার সময় ওওনোর হাঁটু মিগুয়েলের শরীরে সজোরে আঘাত করে। সংঘর্ষের পরপরই টেনেরিফের ফরোয়ার্ড মাটিতে পড়ে যান।

প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে একটি সাধারণ ফাউল বলে মনে হলেও, মিগুয়েলের নড়াচড়া না দেখে দ্রুত পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। তারা দ্রুত চিকিৎসকদের মাঠে আসার সংকেত দেন। মুহূর্তের মধ্যেই স্টেডিয়ামের পরিবেশ শোকাতুর হয়ে ওঠে। সতীর্থের এমন আশঙ্কাজনক অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন টেনেরিফের বেশ কয়েকজন ফুটবলার।

মাঠেই পাঁচ মিনিটের বেশি সময় ধরে মিগুয়েলের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে টেনেরিফের নুয়েস্ত্রা সেনোরা দে লা কান্দেলারিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা পুনরায় তার হৃদ্‌স্পন্দন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনায় রেফারি মানুয়েল আনহেল পেরেজ এরনান্দেজ আন্দোরার গোলরক্ষক ওওনোকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ম্যাচটি আর পুনরায় শুরু করা সম্ভব হয়নি। দুই দলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর ২-২ সমতায় থাকা অবস্থাতেই খেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার পর সোমবার সন্ধ্যায় মিগুয়েলের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয় টেনেরিফে। ক্লাবটি জানায়, তাদের ফরোয়ার্ডকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছে। সে সময় তার অবস্থা গুরুতর হলেও স্থিতিশীল ছিল বলে জানানো হয়।

তবে মঙ্গলবার ভোরে স্প্যানিশ ক্লাবটি নতুন করে উদ্বেগজনক খবর দেয়। দ্বিতীয় এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মিগুয়েলের স্নায়বিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার কথা জানায় টেনেরিফে।

কয়েক ঘণ্টা পরেই আসে সবচেয়ে দুঃসংবাদটি। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে মঙ্গলবার সকালে মারা যান মিগুয়েল। ক্লাবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।

শোকবার্তায় টেনেরিফে জানায়, “গভীর বেদনা ও অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে জেসুস দে মিগুয়েলের মৃত্যুর খবর জানাচ্ছি আমরা। এমন শোকের মুহূর্তে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা নেই। এই অসহনীয় দুঃখ লাঘব করার মতোও কিছু নেই।”

মিগুয়েলের অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে স্প্যানিশ ফুটবলারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব স্প্যানিশ ফুটবলার্স (এএফই)। মিগুয়েল এই সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যও ছিলেন। তার মৃত্যুতে পরিবার, স্বজন, সতীর্থ ও টেনেরিফে ক্লাবের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে সংগঠনটি।

১৯৯৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর স্পেনের মাদ্রিদে জন্ম জেসুস দে মিগুয়েল আলামেদার। পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারে তিনি বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। ইউনিয়নিস্তাস দে সালামানকা, নাভালকারনেরো ও কাস্তেয়নের মতো ক্লাবের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা ছিল এই দক্ষ ফরোয়ার্ডের।