জাতীয় চার নেতার স্মরণে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দাবি, অনুষ্ঠানের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকলেও পুলিশ সেখানে হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করায় নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার বিকেল চারটায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ৬ নম্বর গ্যালারিতে এই প্রদর্শনীর শুভ সূচনা হওয়ার কথা ছিল।
আগারগাঁও এলাকায় অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ষষ্ঠ তলার ৬ নম্বর গ্যালারিতে ‘স্বাধীনতাসংগ্রামে জাতীয় চার নেতা’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। ১৫ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আজ বিকেল চারটায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, যেখানে মূল বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের কর্মকর্তা ও সাবেক সচিব ওয়ালিউল ইসলামের। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রদর্শনীটি আগামী ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলমান থাকার কথা ছিল।
এই বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি ও প্রাবন্ধিক মফিদুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অনুষ্ঠানে তাঁদের সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল। অনুষ্ঠান শুরুর নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে পুলিশ এসে তাঁদের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে বলে। তারা আক্রমণের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানায়। যেহেতু এটি একটি জাদুঘর, অনেক মূল্যবান নিদর্শন রয়েছে, তাই পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁরা অনুষ্ঠান স্থগিত রেখেছেন।” প্রদর্শনীটি পরবর্তীতে পুনরায় আয়োজন করা হবে কি না, সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, সেখানে নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ফ্যাসিস্টের দোসররা এই অনুষ্ঠানে আক্রমণ করতে পারে। ফলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গিয়ে কর্তৃপক্ষকে অনুষ্ঠান বন্ধ করার অনুরোধ জানান। এরপরই জাদুঘর কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানটি স্থগিত করে।
উল্লেখ্য, আজ ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস, যা জাতির ইতিহাসে এক অত্যন্ত বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাতের আঁধারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
জাতীয় চার নেতাকে হত্যার এই ঘটনায় ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা ইতিহাসে ‘জেলহত্যা মামলা’ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ ২১ বছর এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম স্থবির ছিল। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। অবশেষে ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে ৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সাজাপ্রাপ্ত এই ১১ আসামির মধ্যে ১০ জনই দীর্ঘ সময় ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদ দীর্ঘকাল পলাতক ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাতেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন। দেশে ফেরার পর ২০২০ সালের এপ্রিলে তিনি ধরা পড়েন এবং ওই মাসেই তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।