দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবক্ষয় শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগবিরোধী প্রার্থীদের জয়লাভ করতে দেওয়া হয়নি। ভোট কারচুপি, বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন এবং ক্ষমতা এককেন্দ্রিক করার মাধ্যমে দেশে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পথ প্রশস্ত হয়।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মুনসুন থিয়েটারে ‘তিয়াত্তরের নির্বাচন: ভোট চুরির আওয়ামী মডেলের সূচনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারটি ছিল তাদের ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজের তৃতীয় পর্ব।

সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, “১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। নির্বাচনের আগে সব সমীক্ষায় দলটি অন্তত ২৫০টি আসনে জিতবে বলে ধারণা করা হয়েছিল; কিন্তু এর পরও বিরোধী প্রার্থীদের জিততে দেওয়া হয়নি। এখানেই নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের সূচনা।”

স্বাধীন দেশে ভিন্নমতকে অস্বীকার করার প্রবণতা আওয়ামী লীগই শুরু করেছিল বলে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান জানান, বিরোধীদের সংসদে আসার পথ বন্ধ করার পর চতুর্থ সংশোধনী এবং বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষমতাকে এককেন্দ্রিক করা হয়।

১৯৭৩ সালে যে ধরনের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, পরবর্তীতে তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি আরও বলেন, “জুলাই গণ–অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, জনগণের সামনে বিকল্প বন্ধ করে দিলে শেষ পর্যন্ত জনগণই বিকল্প হয়ে ওঠে।” তাই আগামী দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং মানুষের পছন্দের সরকার বেছে নেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে আনা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান। তিনি জানান, ওই নির্বাচনে ১৫ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিভিন্ন আসনে বিরোধী প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার খবর প্রচারিত হলেও শেষ মুহূর্তে ফলাফল বদলে দেওয়া হয়।

আবু সাঈদ খান অভিযোগ করেন যে, খন্দকার মোশতাক আহমেদের আসনের ব্যালট বাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছিল। তাঁর মতে, নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র সাতটিতে। এর ফলে বিরোধী রাজনীতি এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। পাশাপাশি রক্ষীবাহিনীর দমন-পীড়ন তৎকালীন পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতপূর্ণ করে তোলে।

অন্যদিকে, জুলাই-পরবর্তী সময়ে মব-সহিংসতা এবং নিজেদের বিচার করার প্রবণতাকে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেন সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা। তিনি বলেন, “দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দেশের জনগণের। সরকারকে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।” একইসাথে তিনি বিএনপির নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে বলেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে যে তাঁরা দলের অংশ, সরকারের নন।

অতীতের ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ভিন্নমতের মানুষকে একই মঞ্চে এনে তাঁদের কথা শোনার সুযোগ তৈরি করাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি। জাদুঘর এমন একটি আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবেন এবং আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কারও ওপর কোনো নির্দিষ্ট মত চাপিয়ে দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।

পুরো সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন জাদুঘরের গবেষণা কর্মকর্তা তুহিন খান।