কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার নির্বাচনি হলফনামা এবং আয়কর রিটার্নে সম্পদের হিসাবসহ বিভিন্ন আর্থিক তথ্যে গুরুতর অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করেছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুরের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেল ৪টা ২৫ মিনিটে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে এই অভিযোগটি জমা দেন তিনি। অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর আবেদনকারী সেখান থেকে একটি গ্রহণপত্র সংগ্রহ করেন।
সিরাজুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য আমির হামজার নির্বাচনি হলফনামা, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং নির্বাচনি ব্যয়ের বিবরণীর মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি বিদ্যমান। তিনি দাবি করেন, এই তথ্যগুলো যথাযথভাবে যাচাই করা হলে তার সম্পদ ও আয়-ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া অভিযোগে সিরাজুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালের ৩০ জুনের আয়কর রিটার্নে সংসদ সদস্যের ব্যাংক ব্যালেন্স শূন্য দেখানো হয়েছে। তবে তার দাবি, ওই সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, কুষ্টিয়া শাখার একটি হিসাবে প্রায় ৬৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ টাকা ৮ পয়সা জমা ছিল।
অভিযোগকারীর আরও দাবি, মুফতি আমির হামজা প্রতি শুক্রবার আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে এক লাখ টাকা এবং বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সম্মানি পেয়ে থাকেন। কিন্তু এই আয়ের কথা নির্বাচনি হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়কর রিটার্নে তার বার্ষিক আয় ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে, যা হামজা এন্টারপ্রাইজের কাপড় ও বইয়ের ব্যবসা থেকে এসেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর্থিক তথ্যের পার্থক্যের বিষয়ে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনি হলফনামায় সংসদ সদস্যের নগদ অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে তা ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর মতে, এখানে ৩৬ লাখ টাকার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে।
এছাড়া হলফনামায় কৃষি সম্পত্তির মূল্য ১১ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে তা ১৪ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা উল্লেখ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্যের স্ত্রীর কৃষি সম্পত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সিরাজুল ইসলাম। তার অভিযোগ, নির্বাচনি হলফনামায় স্ত্রীর কৃষিজমির পরিমাণ ১২ কাঠা বা ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্য ২ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। অথচ আয়কর রিটার্নে জমির পরিমাণ ১২০ শতাংশ ও মূল্য ১৭ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে বলে তার দাবি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত একটি দলিলের মাধ্যমে সংসদ সদস্যের স্ত্রী ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কিনেছেন। দলিল নম্বর ৬৪৯৮/২০২৫ উল্লেখ করে আবেদনকারী দাবি করেছেন, জমিটির মূল্য ৬ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর অংশের মূল্য ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা। এই সম্পত্তির কথা নির্বাচনি হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি।
কুষ্টিয়া শহরের রাহিনী মৌজায় সংসদ সদস্যের নামে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ জমির একটি প্লটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে। ২০১৪ সালে কেনা ওই জমির বর্তমান আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ টাকা বলে দাবি করে আবেদনকারী জানান, এই সম্পত্তিটি নির্বাচনি হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করা হয়নি।
গাড়ির তথ্যের বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সংসদ সদস্যের ব্যবহৃত ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৯-১৭৫৭ নম্বর গাড়ির মূল্য নির্বাচনি হলফনামায় ২৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে গাড়িটির তথ্য গোপন করা হয়েছে।
বাড়িভাড়া আয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে অভিযোগে। নির্বাচনি হলফনামায় সংসদ সদস্যের স্ত্রীর আয় হিসেবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া দেখানো হয়েছে। তবে বাড়িটি স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানাধীন হওয়া সত্ত্বেও তাদের আয়কর রিটার্নে এই আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী।
নির্বাচনি ব্যয়ের বিষয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনি ব্যয়ের বিভিন্ন খাতে ৩৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর বাইরে ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাংক হিসাব থেকে আরও ৩৮ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আবেদনকারীর হিসাব অনুযায়ী, এসব মিলিয়ে নির্বাচনে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭২ লাখ টাকা, যা প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত ব্যয়সীমার চেয়ে বেশি। তবে ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলন করলেই তা নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে গণ্য হয় না; তাই উত্তোলিত অর্থের প্রকৃত ব্যবহার ও নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নির্বাচনি হলফনামায় সংসদ সদস্যের বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬০ টাকা দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ড্রাইভারের বেতন, ইউটিলিটি বিল ও সন্তানদের শিক্ষাব্যয় এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। অভিযোগে বলা হয়েছে, হলফনামায় দুই সন্তান পড়াশোনা করছে উল্লেখ থাকলেও আয়কর রিটার্নে শিক্ষাব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে।
এছাড়া সংসদ সদস্যের পাঁচতলা ভবন ও জমির সম্মিলিত মূল্য ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৮৩ টাকা দেখানো হলেও তা প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করা হয়েছে। ভবনটি স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ মালিকানাধীন হলেও স্ত্রীর আয়কর রিটার্নে এর তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
আয়কর রিটার্নে ১১৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম বা ১০ ভরি স্বর্ণ দেখানো হলেও নির্বাচনি হলফনামায় তা উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এছাড়া হলফনামার বিভিন্ন ক্রমিকের তথ্যের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অসংগতি রয়েছে এবং ব্যাংকের নাম ও হিসাব নম্বর উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন আবেদনকারী।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর সংশ্লিষ্ট বিধান উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের কাছে এই আনুষ্ঠানিক তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে। সিরাজুল ইসলামের দাবি, অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক, যানবাহন নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং ভূমি ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় মূল দলিলাদি উপস্থাপন এবং তদন্তে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন।
আবেদনে অভিযোগগুলো তদন্ত করে শুনানির সুযোগ দেওয়ার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী প্রার্থিতা ও নির্বাচন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
এই বিষয়ে অভিযোগকারী সিরাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নির্বাচনি হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে অসংগতি পেয়েছি। এসব তথ্যের সঠিকতা যাচাই করে প্রকৃত চিত্র বের করার জন্যই নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছি।”
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা বলেন, “আমি মিটিংয়ে আছি, পরে ফোন করছি।”