ইসরায়েলে দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র একবার তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়েছিল, আর তা ছিল ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন সরকারের মাধ্যমে। সেই জোট সরকারে রাআম দলও অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে মাত্র এক বছরের মাথায় তা ভেঙে যায়।
২০১৫ সালের মার্চ মাসে নির্বাচনের দিন মাত্র ২৮ সেকেন্ডের একটি বিতর্কিত ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। সেই ভিডিওতে তিনি ডানপন্থী ভোটারদের সতর্ক করে দাবি করেছিলেন যে, আরব নাগরিকেরা ‘দলে দলে’ ভোট দিতে যাচ্ছেন। যদিও নির্বাচনের পর প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল করে জয়ী হয়েছিলেন তিনি, তবে এক সপ্তাহ পর ক্ষমা চেয়ে তিনি বলেছিলেন, আরব জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে আঘাত করার কোনো ইচ্ছা তাঁর ছিল না।
১১ বছর এবং ছয়টি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থাকার পর এবার আবারও একই কৌশল অবলম্বন করেন নেতানিয়াহু, তবে এবার তা ছিল অনেক বড় পরিসরে। কিন্তু এবারের লড়াইয়ে তিনি আগের মতো সফল হতে পারেননি। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকেই নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের দাবি, ঘুষ, বিদেশি অর্থায়ন এবং জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আরব দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি করে নিজেদের পক্ষে নিয়েছে’। কট্টর ইহুদি ডানপন্থী দলগুলো এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছে। এমনকি কিছু কট্টরপন্থী নেতা বর্তমান নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট আয়োজনের দাবিও তুলেছেন।
যদিও এখন পর্যন্ত ‘ভোট চুরির’ এই দাবির পক্ষে কোনোconcrete প্রমাণ হাজির করতে পারেননি নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা, তবে তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁরা মূলত আরবদের দুটি দল—জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম-এর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছেন। এবারের নির্বাচনে এই দুটি দল রেকর্ডসংখ্যক আসন জয় করেছে, যা ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন ক্ষমতাধর নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিরোধী জোটের প্রধান গাদি আইজেনকট গত বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় এই অভিযোগের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, তারা নির্বাচনে হেরে গেছে বলেই এসব করছে। আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধী জোট ৪৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোট সবচেয়ে বেশি ৫৩টি আসন পেয়েছে।
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা ৬১টি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বা বিরোধী কোনো জোটই এককভাবে জয়ী বা পরাজিত হয়নি। জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম মিলে ১৯টি আসন লাভ করেছে। এর অর্থ হলো, সরকার গঠন করতে হলে যে কোনো জোটকেই আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে।
আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে খুব দ্রুত নতুন সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস দেশটি এক গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাবে।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের পর তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো ইহুদি ও আরবদের মধ্যে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহযোগিতাকে অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করা এবং তা ঠেকানো। কারণ এমন সহযোগিতা তাঁর ক্ষমতার ভিতকে দুর্বল করে দিতে পারে। এই লক্ষ্যেই ভোটের অনেক আগে থেকেই আরব দলগুলোকে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন তিনি।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে নেতানিয়াহু এবং রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচ আরব অধ্যুষিত এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ২ হাজার পর্যবেক্ষক মোতায়েনের পরিকল্পনা করেন। তাঁরা বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন আরবদের ভোটকেন্দ্রগুলোতে জালিয়াতির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের দিন সকালে রাআমের তিন কর্মীকে ভোটের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। তবে পরবর্তীতে চ্যানেল১২ নিউজ প্রকাশ করে যে, গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের কাছে প্রথম তথ্য দিয়েছিলেন নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ। তিনি প্রচলিত নিয়ম এড়িয়ে সরাসরি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরবর্তীতে আদালত অভিযুক্তদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের আবেদন নাকচ করে দেন এবং কয়েকজনকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে নেতানিয়াহুর প্রচারশিবির এই ঘটনাটিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগায় এবং দাবি করে যে, নির্বাচনে ‘চুরি করে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার’ চেষ্টা চলছে।
ভোট গণনার সময় এই প্রচার আরও তীব্র হয়। বুধবার লিকুদ পার্টি জানায়, রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের বিরুদ্ধে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির শত শত সাক্ষ্যপ্রমাণ তারা জমা দিয়েছে। পাশাপাশি নেতানিয়াহুপন্থী চ্যানেল১৪ দাবি করে, বিদেশি কোনো সূত্র থেকে কয়েক কোটি শেকেল আসার সন্দেহ রয়েছে।
এরই মধ্যে একটি চিঠি ফাঁস হয়। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের উপপ্রধান বিচারপতি নোয়াম সলবার্গ জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনিকে একটি চিঠি লিখে বিদেশি অর্থায়নের ‘গুরুতর সন্দেহের’ বিষয়ে তদন্তের অনুরোধ জানান। পরে জানা যায়, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর জিনি নিজেই ওই চিঠি লেখার অনুরোধ করেছিলেন। সলবার্গ তাঁর চিঠিতে লিখেছিলেন, অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্যপ্রমাণ কতটা গুরুতর, তা তিনি যাচাই করতে পারেননি। তবে লিকুদ ও ডানপন্থী রাজনীতিকরা এই চিঠিটিকেই অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে প্রচার করতে থাকেন।
গত রোববার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান, শিন বেতের প্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেল এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা স্পষ্ট করেন যে, বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগের সত্যতা মিললেও তা নির্বাচনের ফল পাল্টে দেবে না বা পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করবে না। সলবার্গ তাঁর বিবৃতিতে বলেন, “ভোটের মাধ্যমে আপনারা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তার সম্মান জানানো হবে।”