তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত রোববার সরকার নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করলেও তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পর্যন্ত প্রথম সভা আয়োজনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, আজ মঙ্গলবার গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও মিরপুর এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয় এবং পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
শ্রম মন্ত্রণালয় গত রোববার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিম্নতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করেছে। এই বোর্ডে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। এছাড়া মালিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
একই দিনে জারি করা আরও একটি প্রজ্ঞাপনে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিন এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের (বিজিআইডব্লিউএফ) সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য গঠিত এই মজুরি বোর্ডটি মোট ছয় সদস্য নিয়ে কাজ করবে। বোর্ডের সভাপতিত্ব করবেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।
বোর্ডের প্রথম সভা কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান আজ দুপুরে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা শিগগিরই মজুরি বোর্ডের সভা করব। আমরা সভা করার জন্য প্রস্তুত।’
তিনি আরও জানান, সর্বশেষ মজুরি বোর্ডের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন জারির ৪৫ দিন পর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ছয় থেকে সাত মাস সময় লেগেছিল। তবে এবার তেমনটা হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। সরকার দ্রুত সময়ের মধ্যে মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম শেষ করতে আন্তরিক বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি আনোয়ার হোসাইন ও বাবুল আখতার গতকাল সোমবার শ্রম ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে তাঁরা দ্রুত সময়ের মধ্যে মজুরি বোর্ডের সভা ডাকার অনুরোধ জানান এবং এই বিষয়ে বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেওয়ার কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে বাবুল আখতার বলেন, ‘সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নিম্নতম মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়েছিল। সেই হিসেবে আগামী ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো হবে। শ্রমিকেরা যেন জানুয়ারিতে মজুরি হাতে পান, সেভাবে আমরা কাজ করব। আমাদের বিলম্ব হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রয়োজনে আমরা মজুরি বোর্ডে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করব। রাতভর বৈঠক করতেও আমাদের আপত্তি নেই। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ে আমরা কোনো ছাড় দেব না।’
উল্লেখ্য যে, তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ নিম্নতম মজুরি বোর্ড ২০২৩ সালে গঠিত হয়েছিল। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর মজুরি কাঠামো কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। শ্রম মন্ত্রণালয় ৯ এপ্রিল মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধি নিয়োগ করে। সেই বোর্ড মোট ছয়টি সভা করার পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরি করার সুপারিশ করে, যার ভিত্তিতে ডিসেম্বরে সরকার চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে।
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৯৯৪ সালে প্রথমবারের মতো নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়, যা ৯৩০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে এই মজুরি বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। ২০১০ সালের মজুরি বোর্ডে নিম্নতম মজুরি তিন হাজার টাকা এবং ২০১৩ সালের বোর্ডে ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের মজুরি বোর্ড পোশাক শ্রমিকদের জন্য আট হাজার টাকা নিম্নতম মজুরি চূড়ান্ত করেছিল।