মাত্র এক সপ্তাহ আগে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন হ্যারি কেইন। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের মতো তারকাদের পেছনে ফেলে বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় পরালেও, এই পুরস্কারের চেয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। কেইনের মতে, ব্যক্তিগত অর্জন আর দলীয় সাফল্যের মধ্যে বেছে নিতে হলে তিনি নির্দ্বিধায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফিকেই প্রাধান্য দেবেন। একই সঙ্গে ৩৩ বছর বয়সী এই তারকা স্পেনের লা লিগায় খেলার এক অপূর্ণ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন।

আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বে আতলেটিকো মাদ্রিদের মুখোমুখি হবে বায়ার্ন মিউনিখ। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামে এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে, যা বাংলাদেশ সময় বুধবার (৪ নভেম্বর) ভোর ২টায় শুরু হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ের আগে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের ক্যারিয়ারের অর্জন, বর্তমান মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন কেইন।

গত ২৬ অক্টোবর লন্ডনে আয়োজিত জমকালো অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জয় করেন কেইন। দীর্ঘ ২৫ বছর পর কোনো ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই অনন্য সম্মান অর্জন করলেন তিনি। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে মোট ৬৫ ম্যাচে ৭৩টি গোল করে নজর কাড়েন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তার এই বিধ্বংসী পারফরম্যান্সের ওপর ভর করে বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ এবং জার্মান সুপার কাপের শিরোপা জয় করেছে বায়ার্ন মিউনিখ।

এত বড় ব্যক্তিগত সাফল্যের পর এখন তার লক্ষ্য ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্লাব ট্রফি। সংবাদ সম্মেলনে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ব্যালন ডি’অরের বিনিময়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার সুযোগ পেলে তিনি কি তা গ্রহণ করবেন? জবাবে কেইন বলেন, ‘আমি সব সময় বলেছি, দলীয় শিরোপা জেতার জন্যই আমরা ফুটবল খেলি। আমাদের খেলায় দলের সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

অবশ্য ব্যালন ডি’অর জয়ের অনুভূতি তার কাছে অত্যন্ত বিশেষ। ইংলিশ স্ট্রাইকার বলেন, ‘গত সপ্তাহে ব্যালন ডি’অর জয় আমার জীবন ও ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অনুভূতি ছিল। ব্যক্তিগতভাবে সেটি ছিল অসাধারণ একটি সন্ধ্যা।’

তবে ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়ে সতীর্থদের সঙ্গে সাফল্য উদ্‌যাপনের আনন্দকে তিনি বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। কেইনের বিশ্বাস, বায়ার্নের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে সতীর্থদের সঙ্গে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার অনুভূতি হবে অবিশ্বাস্য। দুটি অর্জনের মধ্যে কোনটি বেছে নেবেন, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চ্যাম্পিয়ন্স লিগকেই বেছে নেব। তবে এখন আমি এমন অবস্থানে আছি, যেখানে দুটিই জেতার সুযোগ রয়েছে। দেখা যাক কী হয়।’

কেইনের এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের এক অপূর্ণতা। ব্যক্তিগতভাবে ফুটবলের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপার স্বাদ পাননি তিনি। ২০১৯ সালে টটেনহামের হয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন তিনি, কিন্তু মাদ্রিদের এই মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামেই লিভারপুলের কাছে ২-০ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় তার।

সাত বছর পর আবারও সেই স্মৃতিবিজড়িত মাঠে ফিরছেন কেইন। এবারের প্রত্যাবর্তন তার জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আগামী বছরের ৫ জুন চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে এই মেত্রোপলিতানো স্টেডিয়ামেই। অর্থাৎ বায়ার্নকে ফাইনালে তুলতে পারলে একই মাঠে পুরোনো হতাশা মুছে নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ পাবেন তিনি। সেই স্মৃতিচারণ করে কেইন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এই স্টেডিয়ামের স্মৃতি আমার জন্য খুব একটা সুখকর নয়। তবে এখানে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। আশা করি, আগামীকাল ভালো একটি স্মৃতি তৈরি করতে পারব।’

শুধু বায়ার্নের হয়ে নয়, আগামী সপ্তাহে ইংল্যান্ডের জার্সিতে স্পেনের বিপক্ষে এই মাঠেই খেলবেন কেইন। তার প্রত্যাশা, মৌসুমের শেষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলতে এখানে ফিরে ২০১৯ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা বদলে দিতে পারবেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে স্প্যানিশ ফুটবলের প্রতি নিজের গভীর ভালোবাসার কথা জানান কেইন। বিশেষ করে ছোটবেলায় লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথ তাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছিল। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের দুই মহাতারকার খেলা দেখে বেড়ে ওঠার স্মৃতি তিনি এখনো মনে রেখেছেন। স্প্যানিশ ফুটবল নিয়ে কেইন বলেন, ‘বেড়ে ওঠার সময় স্পেনের জাতীয় দল আমাকে সব সময় মুগ্ধ করত। তারা ইউরো ও বিশ্বকাপ জিতেছে। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদে মেসি, রোনালদোর মতো অসাধারণ ফুটবলারদের খেলাও দেখেছি। স্প্যানিশ ফুটবল সব সময়ই অনেক উঁচু মানের।’

তবে এত অনুরাগ থাকা সত্ত্বেও লা লিগায় খেলার সুযোগ পাননি কেইন। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন টটেনহামে এবং ২০২৩ সালে যোগ দেন বায়ার্ন মিউনিখে। স্পেনে খেলার অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে তিনি বলেন, ‘সুযোগটা আসলে কখনো সেভাবে আসেনি। সঠিক সময়ে সুযোগ পেলে লা লিগায় খেলা এবং সেখানকার সেরা ফুটবলারদের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অসাধারণ ব্যাপার হতো।’

স্পেনে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও বর্তমান ক্লাব ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। বরং বায়ার্নে নিজের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। তার মতে, প্রত্যেকের ক্যারিয়ার ভিন্ন পথে এগোয় এবং বায়ার্নে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি।

জার্মান ক্লাবটির সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকলেও তা বাড়ানোর প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কেইন জানিয়েছেন, বড় বিষয়গুলোতে সমঝোতা হয়ে গেছে, এখন কেবল কিছু আনুষ্ঠানিক ও আইনি বিষয় চূড়ান্ত করা বাকি। আশা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।

এদিকে আতলেটিকোর বিপক্ষে ম্যাচের আগে কেইনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রতিপক্ষ কোচ দিয়েগো সিমিওনে। আর্জেন্টাইন এই কোচের মতে, কেইন একজন অসাধারণ ফুটবলার এবং ব্যালন ডি’অরের যোগ্য বিজয়ী। শুধু গোল করার দক্ষতাই নয়, দলের প্রয়োজনে তার পরিশ্রম ও দায়িত্বশীলতারও প্রশংসা করেছেন সিমিওনে। সেই প্রশংসায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কেইনও সিমিওনেকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা কোচ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে মাঠে যে কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে, সেটি সম্পর্কেও সচেতন বায়ার্ন তারকা।

চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তিন ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট নিয়ে ১৪তম স্থানে রয়েছে বায়ার্ন। প্রথম ম্যাচে বোদো/গ্লিমটকে হারানোর পর ভাইকিং ও আর্সেনালের বিপক্ষে ড্র করেছে জার্মান ক্লাবটি। অন্যদিকে চার পয়েন্ট নিয়ে ১৬তম স্থানে রয়েছে আতলেতিকো। দুই দলেরই লক্ষ্য সরাসরি শেষ ষোলোয় ওঠার দৌড়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা।