অতি বিরল পাখিটিকে খুঁজছি দুই যুগ ধরে; কিন্তু দেখা পাইনি কখনো। কারণ, এ দেশে ওটিকে দেখার রেকর্ড ১০ বারেরও কম। এ পর্যন্ত কক্সবাজারের ডুলাহাজারা, ইনানী, কাপ্তাই, হাজারিখিল, লাউয়াছড়া, করমজল ও কুয়াকাটায় দেখা গেছে। গত কয়েক বছরের রেকর্ড পর্যালোচনা করে পাখিটিকে এ সময় কুয়াকাটায় দেখার সম্ভাবনা বেশি মনে হওয়ায় ‘বার্ডিংবিডি ট্যুরস’ ‘কুয়াকাটা পন্থ-পরিযায়ী পাখি খোঁজা অভিযান’ ঘোষণা করল।

আটজনের একটি দলের সাথে ১৫ অক্টোবর রাতে যাত্রা শুরু করি। তবে বাস ছাড়তে দেরি হওয়ায় পরদিন সকালে পাখি খোঁজার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়টি নষ্ট হয়ে যায়। বাস থেকে নেমে হোটেলে বিশ্রাম ও প্রাতরাশ শেষ করে লেম্বুর বনে পৌঁছাতে সকাল সাড়ে ১০টা বেজে যায়। দুপুরের খাবারের আগে ও পরে মোট পাঁচ ঘণ্টা সময় ধরে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে বিরল পাখিগুলোকে খোঁজা হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোথাও তাদের দেখা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত বিফল মনে করে আমরা হোটেলে ফিরে আসি।

পরদিন সকালে অটোভ্যানে করে সাত কিলোমিটার দূরে লেম্বুর বনের দোলনা পয়েন্টে নামি। জিরিয়া ও বালুচরাসহ কয়েকটি সৈকতে পাখির ছবি তোলার পর সরাসরি প্রবেশ করি বাদাবনের গভীরে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বনের বিভিন্ন প্রান্তে পাখিগুলোর সন্ধান করি, তবে কোনো ফল পাওয়া গেল না। সবশেষে আমরা বাদাবন সংলগ্ন ঝাউবনে প্রবেশ করি। এই বনের গাছগুলো বেশ সরু ও উঁচু, যা দেখতে অনেকটা বিদেশি বনের মতো মনে হয়। বনে ঢোকার সাথে সাথেই প্রচুর পাখির কলতান শোনা গেল। সেখানে হাঁড়িচাঁচা, বনমালি, হলদে বউ, দুই–তিন প্রজাতির মাছরাঙা এবং কাঠঠোকরাসহ বহু প্রজাতির পাখির যেন এক মিলনমেলা বসেছিল।

গাছের ডালের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি বনমালির ছবি তোলার চেষ্টা করার সময় হঠাৎ একটি ফিঙে তাকে তাড়া করে, যার ফলে চমৎকার সেই শটটি মিস হয়ে যায়। এরপর লক্ষ্য করলাম, বনে ফিঙেদের আনাগোনা যেন আরও বেড়ে গেল। তাদের বেশির ভাগই ছিল অল্প বয়স্ক পাখি। ফিঙের সাথে দেখা গেল ছোট ভুজঙ্গ। আমি চেষ্টা করলাম প্রতিটি পাখির আলাদা আলাদা ছবি তুলতে, কারণ অতি বিরল এই পাখিটি সাধারণত ফিঙের দলেই অবস্থান করে। ঝাউবনে ফিঙেদের ছবি তুলতে তুলতে হঠাৎ একটি বড় লতায় বুক ও পেটে সাদা ফোঁটযুক্ত একটি ফিঙেকে বসতে দেখলাম। আমার মনে হলো ওর ঠোঁটজোড়া বেশ খাটো ও শক্তপোক্ত। এছাড়া মাথা ও লেজের গঠনও ছিল ভিন্ন। সেই মুহূর্তে সেখানে আমি ও ইকবাল বাবু ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। আমরা দুজনেই একসাথে ক্যামেরার শাটারে ক্লিক করলাম। মাত্র তিনটি ছবি তোলার সুযোগ পাওয়ার পর পাখিটি উড়ে চলে যায়। এরপর আরও দুটি ফিঙের ছবি তুলে আমরা ঝাউবন ত্যাগ করি।

কুয়াকাটার ঝাউবনে দেখা এই খাটো ঠোঁটের ফিঙেটির দৈর্ঘ্য ২৭ থেকে ৩২ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৪৪ থেকে ৬৮ গ্রামের মতো। এর পালকগুলো চকচকে কালো, তবে কাঁধ-ঢাকনির অংশে চাকচিক্য কিছুটা কম। খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে একে সাধারণ ফিঙে থেকে আলাদা করা বেশ কঠিন। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির গড়ন একই রকম। এর লেজ অপেক্ষাকৃত চওড়া এবং অগ্রভাগ বাইরের দিকে ছড়ানো, যা ফিঙের মতো গভীরভাবে চেরা নয়। চোখ গাঢ় বাদামি রঙের। ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা, আঙুল ও নখ সব মিলিয়ে কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির শরীরের ওপরের অংশ ফ্যাকাশে-কালচে বাদামি এবং গলা ও বুকে সাদা তিল ও বগলে ছাই ধূসর রঙ দেখা যায়। অন্যদিকে, প্রথম শীতবর্ষীয় পাখির বুক ও পেটে ধূসরাভ সাদা ছিটছোপের মতো দাগ থাকে।

এই পাখিগুলো সাধারণত বড় পাতার মিশ্র চিরসবুজ, পাতাঝরা ও বাদাবনে বাস করে। তারা গাছের নিচের অংশে, ঝোপঝাড় ও লতাগুল্মের মধ্যে বিচরণ করে। সচরাচর একাকী অথবা জোড়ায় জোড়ায় এদের দেখা মেলে। বাংলাদেশে এই পাখিটি ‘তথ্য অপ্রতুল’ হিসেবে গণ্য। তবে অনেকের মতে, পন্থ-পরিযায়ী হিসেবে তারা অক্টোবরে খুব অল্প কয়েক দিনের জন্য এ দেশে আসে। এরা মূলত কীটপতঙ্গ, ব্যাঙ, সরীসৃপ ও ছোট পাখি খেয়ে জীবনধারণ করে। এদের মিষ্টি কণ্ঠে ‘ফুউইইইট্...ফুউইইইট্...’ শব্দে ডাক শোনা যায়। এছাড়া ‘কোয়্যারশকোয়্যারশ...সুইফট...’ এমন কর্কশ শব্দেও তারা ডাকতে পারে।

এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এই সময়ে তারা হিমালয় ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি বনের গভীরে মাটি থেকে ৪ থেকে ১২ মিটার উঁচুতে গাছের দোডালায় মাকড়সার জালে গাছের বাকল ও ঘাস জড়িয়ে বাটির মতো চ্যাপ্টা বাসা তৈরি করে। তারা লালচে বাদামি ও ধূসর ছিটছোপসহ তিন-চারটি ফিকে গোলাপি ডিম পাড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি যৌথভাবে বাসা তৈরি করলেও ডিমের তা দেয় কেবল স্ত্রী পাখি। ডিম থেকে ছানা ফোটার সঠিক সময় জানা না গেলেও অনেকের মতে তা ১৪-১৫ দিন। ছানাগুলো ১৫ থেকে ২২ দিনের মধ্যে উড়তে শেখে।

কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউবনে দেখা বুক-পেটে সাদা ফোঁটযুক্ত খাটো ঠোঁটের ফিঙেটি আসলে আর কেউ নয়, এটি এ দেশের অতি বিরল পন্থ-পরিযায়ী ও ভবঘুরে পাখি ভুজঙ্গ বা কাকঠুঁটো ফিঙে। পশ্চিমবঙ্গে একে বলা হয় কাকচঞ্চু ফিঙে। এর ইংরেজি নাম ক্রো-বিল্ড ড্রোঙ্গো। এটি ডাইক্রুরিডি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Dicrurus annectens। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই এই পাখির দেখা মেলে। উল্লেখ্য, গত কয়েক দিন ধরে মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানেও এই পাখি দুটিকে দেখা যাচ্ছে।

আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি, বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর