যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন না নেওয়ায় পটুয়াখালীর পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ওই স্থাপনাটির নির্মাণ কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নির্মাণকাজ বন্ধ করার পর কুয়াকাটা পৌরসভা এবং কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে একটি নিষেধাজ্ঞার ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যানারে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে, “এই স্থাপনাটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত নির্মাণের কারণে নির্দেশক্রমে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হলো। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
প্রশাসনের এই পদক্ষেপ গ্রহণের সময় ঘটনাস্থলে কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক উপস্থিত ছিলেন।
প্রশাসনের দাবি, স্থাপনা নির্মাণ আইন অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ভবন নির্মাণ করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এই নির্দিষ্ট জমিটি রেলওয়ে স্থাপনার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এই দ্বিমুখী কারণে স্থাপনাটির নির্মাণকাজ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী মৌজার এস এ ২৯২ নম্বর খতিয়ানে প্রায় ২১ একর ৬৬ শতক জায়গা জুড়ে ইস্তানবুলের এই প্রকল্প কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। প্রকল্প এলাকার ভেতরে একটি মসজিদ এবং একটি কনভেনশন হলের নির্মাণকাজ চলছিল। চলতি বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কুয়াকাটা পৌর এলাকার মুসল্লীয়াবাদ গ্রাম সংলগ্ন এলাকায় ইস্তানবুল হোটেল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকার অন্তত ছয় একর ভূমির উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করে সীমানাদেয়াল তৈরি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন পিরোজপুর-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) মাসুদ সাঈদী। তিনি জামায়াতের প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র। আজ রাত আটটার দিকে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে দেখা যায়, সেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে মাসুদ সাঈদীর নাম ও ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রিসোর্টে বিনিয়োগের জন্য ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। প্রচারণায় এই প্রকল্পটিকে বাংলাদেশের 'হালাল ট্যুরিজম' হিসেবে দাবি করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, মাত্র পাঁচ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এই প্রকল্পের শেয়ারের মালিক হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে।
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক বলেন, “যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকা এবং স্থাপনা নির্মাণ আইন অনুসারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতীত ভবন নির্মাণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তা ছাড়া কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যানে এই জমি রেলওয়ে স্থাপনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া আছে। এ কারণে স্থাপনাটির নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জায়াগাটি বর্তমান বিএস জরিপে এ জায়গা কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন।”
অন্যদিকে, এই জমির মালিকানা নিয়ে আইনি লড়াই চলছে। কলাপাড়া উপজেলার হাড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা রাখাইন উমাচ্যান দেওয়ানি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর দাবি, এই জমির প্রকৃত মালিক তাঁর দাদা চিথাও ও নাথাও।
পুরো বিষয়টি নিয়ে মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রকল্পের স্থানীয় প্রতিনিধি মো. মনির মুসুল্লীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এটি একটি বড় প্রকল্প। এ প্রকল্পের জন্য আমরা ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে যাবতীয় কাগজপত্র নিয়েছি। তা ছাড়া আমরা ইতিমধ্যে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরেও ভবন নির্মাণের অনুমতি চেয়ে আবেদনপত্র জমা দিয়েছি। এমনকি কুয়াকাটা পৌরসভা থেকেও অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। এরপরও দোষ ধরলে অনেক কিছুই ধরা যায়। সবকিছু মিলিয়ে এখন আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এখানে বড় রাজনৈতিক খেলা রয়েছে।”