ফুটবলারদের সম্পর্কে সমাজে একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা রয়েছে। মনে করা হয়, সবুজ মাঠে তাঁরা যতই বুদ্ধিদীপ্ত পাস দিন না কেন, মাঠের বাইরের বাস্তব জীবনে তাঁদের বুদ্ধির যথেষ্ট অভাব। বল পায়ে তাঁরা দুর্দান্ত হতে পারেন, কিন্তু তাঁদের চিন্তাশক্তি বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ততটা সচল নয়—এমনটিই অনেকে মনে করেন।

আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশক এবং তার পরবর্তী সময়েও ফুটবলারদের নিয়ে এই ধরনের ঠাট্টা-তামাশা কম হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের প্রায়ই বোকাসোকা, অতি সহজ-সরল কিংবা বুদ্ধিবিবেচনাহীন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেন পায়ে বল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকলেই মাথায় আর অন্য কিছু থাকার প্রয়োজন নেই!

তবে সময়ের সাথে সাথে ফুটবল যেমন বদলেছে, ফুটবলারদের জীবনযাত্রাও ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে। বর্তমান যুগের একজন খেলোয়াড়কে কেবল পাস দেওয়া, শট নেওয়া কিংবা ট্যাকল করার কথা ভাবলে চলে না। মাঠের বাইরেও তাঁকে সামলাতে হয় প্রচণ্ড মানসিক চাপ, নানা ধরনের প্রলোভন, আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং কঠিন সব সিদ্ধান্তের বোঝা। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, ফুটবলাররা কি সত্যিই বোকা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে একটি বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন। কারো বুদ্ধিমত্তা পরিমাপ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় নিশ্চয়ই তাঁকে ম্যাচ শেষে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া নয়। ম্যাচ শেষ হলে সাংবাদিকরা সাধারণত প্রশ্ন করেন, ‘গোল করে কেমন লাগছে?’ অথবা ‘জিততে পেরে কেমন লাগছে?’ এর উত্তরে খেলোয়াড়দের কথাগুলোও হয় প্রায় বাঁধাধরা। তাঁরা বলেন, ‘ভালো লাগছে। দলের জয়ে অবদান রাখতে পেরে খুশি।’ ব্যস, এইটুকুতেই সাক্ষাৎকার শেষ হয়ে যায়। এখানে বুদ্ধির গভীরতা পরীক্ষার সুযোগ কোথায়?

এমন সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে খুব বেশি চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হয় না। বরং প্রশ্নকর্তা যদি ভিন্ন আঙ্গিকে কথা বলতে পারেন এবং খেলোয়াড়কে নিজের মতো করে কথা বলার সুযোগ দেন, তবেই তাঁর ব্যক্তিত্ব, আগ্রহ, চিন্তাভাবনা এবং জীবনবোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে সব খেলোয়াড় সমানভাবে কথা বলতে পারেন না। কেউ লাজুক স্বভাবের, কেউ সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত সতর্ক, আবার কেউ খুব সহজে কাউকে বিশ্বাস করেন না। কারো কথা শুনে ভালো লাগতে পারে, আবার কারো ক্ষেত্রে নাও লাগতে পারে। কিন্তু এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা যায় না।

ফুটবলারদের বুদ্ধি নিয়ে যে পুরোনো ধারণাটি প্রচলিত, তা সম্ভবত তাঁদের পেশার জটিলতাকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারারই ফল। একজন পেশাদার ফুটবলারকে প্রতিদিন অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কখন কী করতে হবে, কার কথা শুনতে হবে, কার কথা এড়িয়ে চলতে হবে, কখন নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে বিসর্জন দিতে হবে এবং কখন নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে—এসবই তাঁদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ। এই সবকিছুর জন্য কেবল ফুটবলীয় দক্ষতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিচক্ষণতা, যাকে বর্তমান সময়ে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বলা হয়।

ফুটবলে যেমন প্রতিভার গুরুত্ব অপরিসীম, তেমনি জরুরি মানসিক দৃঢ়তা। প্রশংসা সামলানো যেমন কঠিন, তেমনি সমালোচনা সহ্য করাও চ্যালেঞ্জিং। ভালো খেললে চারদিক থেকে প্রশংসা আসে, আর খারাপ খেললে শুরু হয় সমালোচনার ঝড়। উভয় পরিস্থিতিতেই মাথা ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত জরুরি, কারণ ফুটবল খেলা অপরিণত সিদ্ধান্তের শাস্তি দিতে খুব একটা দেরি করে না।

আর এই চাপ কেবল মাঠের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি নেওয়ার সময়ই আসে না, মাঠের বাইরেও থাকে নানা চাপ। যেমন দলবদল। ফুটবল এখন একটি বিশাল ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। প্রচার, অর্থ, খ্যাতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব মিলিয়ে খেলোয়াড়দের জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিপদ। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে আরও সচেতন, বিচক্ষণ ও পরিণত হতে হয়।

একজন খেলোয়াড় কোথায় যাবেন, কোন ক্লাবে খেলবেন কিংবা কোন কোচের অধীনে কাজ করবেন—এই সিদ্ধান্তগুলো তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। তবে সব সময় খেলোয়াড়ের ইচ্ছা বা স্বার্থকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিনিধির সুবিধা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা কমিশনের অঙ্কটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।

গত গ্রীষ্মের দলবদলেও এমন কিছু চুক্তি দেখা গেছে, যেখানে খেলোয়াড়ের জন্য কোন দলটি সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল, তা খুব একটা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। নতুন দলে গিয়ে খেলার সুযোগ পাবেন কি না, কোচের পরিকল্পনায় তাঁর জায়গা আছে কি না কিংবা একই পজিশনে কতজন খেলোয়াড় আছেন—এই প্রশ্নগুলোর চেয়ে অন্য হিসাবগুলো বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এই পরিস্থিতি সামলানো আরও বেশি কঠিন। বয়স এবং অভিজ্ঞতা কম হওয়ায় চারপাশে উপদেষ্টার অভাব থাকে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্যারিয়ার গড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি তাঁকেই নিতে হয়। কখনো কখনো সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় এমন কিছু মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে, যাঁরা তাঁর খুব কাছাকাছি থাকেন। এখানেই প্রয়োজন দৃঢ় চরিত্র এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিষ্কার ধারণা।

বিশ্বকাপের পর এমনই এক তরুণ ফুটবলারের সামনে কঠিন সময় এসেছিল। টুর্নামেন্টে নিজের সেরাটা দিতে না পারায় তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি হয়তো তিনি নষ্ট করে ফেলেছেন। পরের বিশ্বকাপে জাতীয় দলে জায়গা পাবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। হতাশা কাটাতে চারপাশের অনেকেই তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন এবং বলছিলেন যে, এতটা ভেঙে পড়ার কিছু নেই।

কিন্তু তাঁর একজন অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা ভিন্ন কথা বলেছিলেন। তিনি সরাসরি জানিয়েছিলেন, তিনি নিজেই নিজেকে হতাশ করেছেন এবং এই সুযোগ হয়তো আর ফিরে আসবে না। কথাটি শুনতে খুব কঠিন ছিল, বিশেষ করে যখন সবাই সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত। কিন্তু সেই তরুণ ফুটবলার কথাটি মনে কষ্ট না পেয়ে বরং কাজে লাগিয়েছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে আগে থেকে ঠিক করা সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা তিনি বাতিল করেন, যদিও সেই টাকার কোনো ফেরত পাননি। ছুটির বদলে তিনি বেছে নেন প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ায় কঠোর অনুশীলনের ক্যাম্প। প্রাক-মৌসুম প্রস্তুতিতে তিনি নিজেকে দুর্দান্ত শারীরিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন।

সান্ত্বনা শুনতে ভালো লাগলেও সব সময় তা কাজে আসে না। কখনো কখনো কঠিন সত্যটি মেনে নিয়ে নিজের ভুল শুধরে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এখানে ফুটবলারদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের খুব একটা পার্থক্য নেই। আমাদের জীবনেও তো এমনটি ঘটে! সকালে অফিস থাকার কথা, কিন্তু আগের রাতে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমে উঠেছে। শরীর বিশ্রাম চাইলেও মন চায় আরও কিছুক্ষণ বাইরে থাকতে। পরীক্ষার আগে পড়ার বদলে সিরিজের পর্ব শেষ করার তাড়না কাজ করে। যা করা উচিত, তার বদলে যা করতে ইচ্ছা করে, আমরা সেটাই করে বসি।

বিশের কোঠায় থাকা কতজন মানুষই বা কঠিন সমালোচনা শুনে মন খারাপ না করে নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেন? কতজনই বা নিজের পছন্দের ছুটি ত্যাগ করে ভবিষ্যতের জন্য কঠোর পরিশ্রম বেছে নেন?

ফুটবলারদের কাছ থেকে মানসিক দৃঢ়তা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশা করা অমূলক নয়, বরং তাঁদের পেশার বাস্তবতাই এমন। তাঁদের ভুলের মূল্য অনেক বেশি এবং সঠিক সিদ্ধান্তের পুরস্কারও হয় বিশাল। ফুটবল এখন অনেক বড় ব্যবসা। প্রচার, অর্থ, খ্যাতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সব মিলিয়ে খেলোয়াড়দের জীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। সুযোগ যেমন বেড়েছে, বিপদও বেড়েছে। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে আরও সচেতন, বিচক্ষণ ও পরিণত হতে হয়।

হয়তো ফুটবলাররা আগের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠেছেন। আবার এমনও হতে পারে যে, আগে আমরা তাঁদের বুদ্ধিমত্তার দিকটি ঠিকমতো দেখিনি। মাঠে তাঁদের কাজ কেবল বল নিয়ে দৌড়ানো নয়; প্রতিটি মুহূর্তে পরিস্থিতি পড়তে হয়, সম্ভাবনা বুঝতে হয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যে পেশায় এক সেকেন্ডের ভুলে পুরো ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যায়, সেখানে দূরদর্শিতা আর দায়িত্ববোধের প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই।

ফুটবলারদের বোকা ভাবার দিন তাই বোধ হয় শেষ। বরং এখনকার ফুটবলে শুধু পায়ে নয়, মাথাতেও খেলতে হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, মাঠের বাইরের খেলাটাও এখন কম কঠিন নয়।