মাঠে দর্শকের ভিড় বাড়ছে, বাড়ছে পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিনিয়োগ। নারী ফুটবলের জনপ্রিয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তবে এই দৃশ্যমান অগ্রগতির সুফল মাঠের খেলোয়াড়েরা কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের সংগঠন ফিফপ্রোর সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক চিত্র। আর্থিক সংকট এবং মানসিক চাপসহ নানা প্রতিকূল কারণে প্রত্যাশিত সময়ের আগেই ফুটবল ক্যারিয়ার ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক নারী ফুটবলার।

সোমবার (১২ অক্টোবর) নারী ফুটবলারদের কর্মপরিবেশ নিয়ে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ফিফপ্রো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮০০ ফুটবলারের ওপর পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ খেলোয়াড় নির্ধারিত সময়ের আগেই ফুটবল জীবন শেষ করার কথা বিবেচনা করছেন।

আগাম অবসরের কথা ভাবা ফুটবলারদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ আর্থিক সমস্যাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া ৪৬ শতাংশ খেলোয়াড় জানিয়েছেন মানসিক চাপের কথা।

ফিফপ্রো জানিয়েছে, গত এক দশকে নারী ফুটবলে বিনিয়োগ ও আয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও সেই সুফল সব খেলোয়াড়ের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় মূল্যস্ফীতির হিসাব সমন্বয়ের পরও নারী ফুটবলারদের ক্লাব থেকে পাওয়া গড় মাসিক বেতন তিন গুণ বেড়ে ২ হাজার ৬০১ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে অর্ধেকের বেশি নারী ফুটবলারের মাসিক বেতন ১ হাজার ৬৬৯ ডলারের বেশি নয়। অর্থাৎ, উচ্চ বেতন পাওয়া তুলনামূলক কমসংখ্যক ফুটবলারের কারণে সামগ্রিক গড় বাড়লেও অধিকাংশ খেলোয়াড়ের আয় এখনো বেশ কম।

বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের জরিপে অন্তর্ভুক্ত ১০টি দেশে নারী ফুটবলারদের গড় বেতন সংশ্লিষ্ট দেশের ন্যূনতম মজুরিরও নিচে রয়েছে। পশ্চিম ইউরোপ ও এশিয়া-ওশেনিয়া অঞ্চলেও গড় বেতন জাতীয় ন্যূনতম মজুরির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু বেতন নয়, চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া মাত্র ৫৬ শতাংশ নারী ফুটবলারের কর্মসংস্থান চুক্তি রয়েছে। ক্লাব থেকে পেনশনের সুবিধা পান মাত্র ১৩ শতাংশ। আর ৪৭ শতাংশ খেলোয়াড় জানিয়েছেন, তাদের ক্লাবে পর্যাপ্ত কর্মী নেই।

চুক্তির মেয়াদের ক্ষেত্রে অবশ্য কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া গেছে। ২০১৭ সালে নারী ফুটবলারদের চুক্তির গড় মেয়াদ ছিল ১২ মাস, যা বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ১৯ মাস।

তবে কর্মপরিবেশ নিয়ে খেলোয়াড়দের সম্মিলিত দর-কষাকষির সুযোগ এখনো সীমিত। ফিফপ্রোর পর্যালোচনা করা ৩০টি জাতীয় নারী ফুটবল লিগের মাত্র আটটিতে খেলোয়াড়দের ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথ চুক্তি রয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যের চিত্রও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জরিপে অংশ নেওয়া ৫৭ শতাংশ ফুটবলার জানিয়েছেন, তারা মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে অর্ধেকই ক্লাব থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি।

ফিফপ্রোর নারী ফুটবল বিভাগের পরিচালক অ্যালেক্স কালভিনের মতে, নারী ফুটবলের উন্নতি হলেও এর সুফল মূলত শীর্ষ পর্যায়ের অল্পসংখ্যক খেলোয়াড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “নারী ফুটবল অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু বাকি ৯৫ শতাংশ খেলোয়াড়ের জন্য এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।”

কালভিনের মতে, অনেক নারী ফুটবলারের কাছে পেশাদার মানের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করা হচ্ছে, অথচ তাদের সেই মানের প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা কিংবা কাজের পরিবেশ দেওয়া হচ্ছে না। খেলাটির জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি এবং বাড়তি কাজের চাপও খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে খেলোয়াড়দের জন্য ন্যূনতম বেতন, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ফিফপ্রো। সংস্থাটি চায়, এসব সুবিধার নিশ্চয়তা জাতীয় পর্যায়ের কর্মসংস্থান চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

তবে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি নেতিবাচক নয়। মাতৃত্বকালীন সুরক্ষায় উন্নতির কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি। ২০২১ সালে ফিফা নারী ফুটবলারদের জন্য ন্যূনতম মাতৃত্বকালীন সুবিধার নিয়ম চালু করে। এরপর আগাম অবসরের কথা বিবেচনা করা খেলোয়াড়দের মধ্যে পরিবার গঠনকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করার অনুপাত ২০১৭ সালের ৪৭ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নেমেছে।

ফিফপ্রোর মতে, এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, যথাযথ নিয়ম ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলে নারী ফুটবলারদের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করা সম্ভব। তবে খেলাটির বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।