যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের ওপর যে প্রতিষ্ঠানের জন্ম, তার সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হলো কত মানুষকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। সেই হিসেবে জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটি একই সাথে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং চরম অসহায়ত্বের একটি অবস্থান। এই পদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিশ্বের বিবেকের ভাষায় কথা বলতে হয়, অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে বাধ্য করার মতো বাস্তব ক্ষমতা তাঁর হাতে থাকে না।
এই বৈপরীত্যের মাঝেই লানা জাকি নুসাইবার প্রার্থিতা নতুন এক আলোচনার সূত্রপাত করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—একজন নারী কি জাতিসংঘের নেতৃত্বে নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসতে পারবেন? আর একজন ব্যক্তির পরিবর্তন কি ক্ষমতার এই দীর্ঘদিনের পুরোনো কাঠামোকে বদলে দিতে পারে?
লানা জাকি নুসাইবা এখনো মহাসচিব নির্বাচিত হননি। সংযুক্ত আরব আমিরাত গত ২১ অক্টোবর তাঁকে এই পদের জন্য মনোনীত করেছে এবং ২৭ অক্টোবর জাতিসংঘে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে একটি উন্মুক্ত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের পর সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগ করে। তাই তাঁর সম্ভাব্য জয়ের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা গেলেও, নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।
যদি তিনি নির্বাচিত হন, তবে তিনি হবেন জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব। সমতার কথা বলা একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে। নুসাইবার প্রার্থিতার মূল শক্তি হলো তাঁর দীর্ঘ বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা। ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি এবং ইউএন উইমেনের নির্বাহী বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন। আমিরাতের নিরাপত্তা পরিষদ সদস্যপদকালে গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং আফগান নারীদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা দেশটির সরকারি বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রমাণ দেয়। তবে রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা এবং সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করার পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদে মহাসচিবকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে তাঁকে মধ্যস্থতাকারী, সংকটের সতর্কবার্তা প্রদানকারী এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সংগঠক হিসেবে কাজ করতে হয়। ৯৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে হওয়া বিষয়গুলো নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনার ক্ষমতা তাঁর থাকে। আবার ১০০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তিনি কোনো সরকারের নির্দেশ গ্রহণ করতে পারেন না। অর্থাৎ, যে রাষ্ট্র তাঁকে মনোনয়ন দেয়, নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্বের পরিধি সেই রাষ্ট্রের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বড় হয়।
তবে এই আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা বাস্তব ক্ষমতার সমার্থক নয়। মহাসচিবের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনী নেই, কিংবা রাষ্ট্রের মতো কর আদায়ের ক্ষমতাও নেই। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের প্রবল বিরোধিতা তিনি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কাটিয়ে উঠতে পারেন না। তাঁর প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে বিশ্বাসযোগ্যতা, সঠিক তথ্য, মধ্যস্থতা এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলার সামর্থ্যের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর আন্তোনিও গুতেরেস গাজার মানবিক বিপর্যয় নিয়ে ৯৯ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করেছিলেন। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, মহাসচিব জরুরি বিপদকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনতে পারেন, তবে সেই সতর্কবার্তাকে কার্যকর সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলোর হাতেই থাকে।
এই পদে প্রথম একজন নারীর আগমন কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, নেতৃত্বের দীর্ঘ একচেটিয়াত্ব কেবল ব্যক্তিগত সুযোগের বিষয় নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমাবণ্টনেরই বহিঃপ্রকাশ। একজন নারী মহাসচিব সেই ইতিহাসে একটি দৃশ্যমান বিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। তবে নারী বলেই কেউ স্বভাবত বেশি শান্তিপ্রিয়, সহমর্মী কিংবা ন্যায়নিষ্ঠ—এমন অনুমান করা যুক্তিসঙ্গত হবে না। নারীর নেতৃত্বকে কেবল মাতৃত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে তাঁর রাজনৈতিক সক্ষমতাকে সংকুচিত করা হয়। মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত তাঁর সিদ্ধান্ত, স্বাধীনতা এবং ফলাফল। একই সঙ্গে তাঁকে এমন দ্বৈত বিচারের মুখোমুখি হতে হতে পারে, যেখানে তাঁর দৃঢ়তাকে ‘কঠোরতা’ এবং সমঝোতাকে ‘দুর্বলতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
প্রতিনিধিত্বের এই পরিবর্তনকে অর্থবহ করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও বদল আনতে হবে। ২০০০ সালেই নিরাপত্তা পরিষদের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাব শান্তি ও নিরাপত্তায় নারীর অংশগ্রহণের গুরুত্ব স্বীকার করেছিল। অথচ জাতিসংঘের হিসাবে শান্তিপ্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীদের ১০ শতাংশেরও কম নারী। ফলে শীর্ষে একজন নারীর অবস্থান এবং শান্তি আলোচনায় নারীদের কার্যকর ক্ষমতা পাওয়া এক বিষয় নয়। স্থানীয় শান্তিকর্মী, বাস্তুচ্যুত নারী এবং সংঘাতপীড়িত জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে আলোচনার সিদ্ধান্তে জায়গা দেওয়াই হবে বড় পরীক্ষা। তাঁদের উপস্থিতি যেন কেবল অনুষ্ঠানের ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
জাতিসংঘের ইতিহাসে রুয়ান্ডা ও স্রেব্রেনিৎসা তার নৈতিক ব্যর্থতার স্থায়ী স্মারক। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতা এবং ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত নিরাপদ অঞ্চল স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা দেখিয়েছে যে, প্রয়োজনীয় সামর্থ্য ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কতটা ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়তে পারে। তবে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ বিচার করতে হলে তার অর্জনগুলোও মনে রাখতে হবে। যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থতার দৃশ্য চোখে পড়লেও, রোগ প্রতিরোধ কিংবা টিকে থাকা শান্তির সুফলগুলো তুলনামূলক কম দৃশ্যমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ১৯৮০ সালে গুটিবসন্ত নির্মূল ঘোষিত হয়। এই অর্জন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিজ্ঞানী ও মাঠকর্মীদের সম্মিলিত সাফল্য। জাতিসংঘ ব্যবস্থার মূল্য এখানেই—বিচ্ছিন্ন সামর্থ্যকে অভিন্ন লক্ষ্যে যুক্ত করা। নামিবিয়া থেকে তিমুর-লেস্তে এবং এল সালভাদর পর্যন্ত যুদ্ধ থেকে শান্তিতে উত্তরণে জাতিসংঘের কার্যকর অবদান রয়েছে।
অন্যদিকে, রুয়ান্ডা ও স্রেব্রেনিৎসার ঘটনাগুলো আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মূল্যহীন। জাতিসংঘ নিজেই এসব ঘটনায় তদন্ত ও মূল্যায়ন করেছে। তাই সব দায় শুধু বৃহৎ শক্তির ওপর চাপিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভুল আড়াল করা চলে না। আবার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ব্যর্থতা দিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বও মুছে দেওয়া যায় না। জবাবদিহির এই স্তরগুলো পৃথক করে নিশ্চিত করতে হবে।
নুসাইবার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার প্রশ্নটি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সহায়তার অভিযোগে আমিরাত আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে, যদিও দেশটি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে নুসাইবার পূর্ববর্তী রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগকে তার একজন কূটনীতিকের ব্যক্তিগত অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখাও অনুচিত। এখানে প্রাসঙ্গিক পরীক্ষা হলো, তিনি কি মনোনয়নদাতা রাষ্ট্রসহ সব পক্ষের আচরণ একই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিচার করতে পারবেন? তাঁর স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা বক্তব্যের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত দিয়েও যাচাই করতে হবে।
পরবর্তী মহাসচিবের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আস্থার সংকট মোকাবিলা করা। দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র বা তার মিত্রের ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা গেলে প্রতিষ্ঠানের নৈতিক কর্তৃত্ব ক্ষয় হয়। গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের মতো সংকটে তাই একই নীতির ধারাবাহিক প্রয়োগ জরুরি। নিরপেক্ষতা মানে সব পক্ষের দায় সমান ঘোষণা করা নয়; বরং নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা এবং অপরাধীর পরিচয়–নির্বিশেষে জবাবদিহির পক্ষে থাকা। কূটনৈতিক দরজা খোলা রাখা ও অন্যায়ের নাম উচ্চারণের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য খুঁজতে হবে।
এর সঙ্গে রয়েছে অর্থায়ন ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমস্যা। সদস্যরাষ্ট্রের চাঁদা সময়মতো না এলে অনুমোদিত কর্মসূচিও কার্যকর করা কঠিন হয়; জাতিসংঘের ২০২৬ সালের আর্থিক মূল্যায়নেও গভীরতর তারল্য–সংকটের কথা এসেছে। সংস্কারের অর্থ তাই শুধু ব্যয় কমানো হতে পারে না। কোন দপ্তরের কাজ পুনরাবৃত্ত, কোথায় সিদ্ধান্ত অযথা বিলম্বিত হয় এবং কোথায় কাটছাঁট মানুষের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা দুর্বল করবে—এসব আলাদা করে দেখতে হবে। একইভাবে শান্তিরক্ষী ও কর্মকর্তাদের অসদাচরণের অভিযোগে স্বাধীন তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিকার নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার অপরিহার্য শর্ত।
জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণসংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসনব্যবস্থাও পরবর্তী নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। এগুলো পৃথক নীতিক্ষেত্র হলেও মানুষের জীবনে পরস্পর যুক্ত। জীবিকা হারানো পরিবার, আশ্রয়হীন শিশু কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের তরুণের কাছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তব সহায়তায়। মহাসচিব একা নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার করতে পারবেন না, কিন্তু আলোচনাকে এগিয়ে নিতে, উপেক্ষিত কণ্ঠকে সামনে আনতে এবং রাষ্ট্রগুলোর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কাজের ব্যবধান প্রকাশ করতে পারবেন।
নুসাইবা নির্বাচিত হলে ইতিহাসের একটি দরজা খুলবে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে শুধু একজন নারী প্রবেশ করলেই জাতিসংঘের পুনর্জন্ম ঘটবে না। পরিবর্তনের গভীরতা বোঝা যাবে সিদ্ধান্তের টেবিলে কারা জায়গা পেল, বিপদের সতর্কবার্তা কত আগে শোনা হলো এবং প্রতিশ্রুত সুরক্ষা কত মানুষের কাছে পৌঁছাল, তা দিয়ে। প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার মর্যাদা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। তার চেয়েও কঠিন অর্জন হবে এমন নেতৃত্ব দেওয়া, যার সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষ জাতিসংঘকে দূরের একটি ভবন নয়, নিজের বিপদের দিনে কার্যকর একটি আশ্রয় হিসেবে চিনতে পারে।
— ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ , অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন। ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই। [email protected]