যশোর শহরতলির হামিদপুরে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটি প্রতিষ্ঠিত হলেও চালুর আট বছরে তা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৮ সালে এই প্ল্যান্টটি স্থাপনের মূল লক্ষ্য ছিল বাসাবাড়ির বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনী বায়োগ্যাস তৈরি করা। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, এই পরিকল্পনাগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবে পরিচ্ছন্ন শহরের স্বপ্ন এখন ফিকে হয়ে গেছে এবং প্ল্যান্ট প্রাঙ্গণে জমে উঠেছে পাহাড়সম ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, যা মারাত্মক পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি করছে।

পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপের অভাব থাকায় ২০২১ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘দ্য স্কেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষর করে পৌরসভা। কিন্তু এই দীর্ঘ চুক্তির পরোতেও সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি কমেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্জ্য অপসারণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই বলে দিন দিন তাদের কষ্ট বাড়ছে। চুক্তি অনুযায়ী বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ এবং তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার কথা থাকলেও সেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টের মূল উদ্দেশ্যই সম্পূর্ণ ব্যাহত হচ্ছে, যা একদিকে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অন্যদিকে বাসযোগ্য শহর নিশ্চিত করার সরকারি উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী কামাল হোসেন জানান, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে প্ল্যান্টটি স্থাপন করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল বাসাবাড়ির পচনশীল বর্জ্য ব্যবহার করে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হবে এবং সেই বায়োগ্যাস দিয়ে প্ল্যান্টের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতের চাহিদাও মেটানো হবে। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। এই অচলাবস্থা কাটাতে ২০২১ সালে ‘দ্য স্কেট লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২০ বছরের জন্য প্ল্যান্টটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার পরও তাদের কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ রয়েছে যে, পৌরসভার বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে সার তৈরির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব মুনাফার জন্য বাইরে থেকে গোবর ও মুরগির বিষ্ঠা এনে সার তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বেসরকারি সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসিআইয়ের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের চাহিদামত এসব উপাদান দিয়ে আলাদা সার তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে পৌরসভা থেকে সংগৃহীত বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত না হয়ে প্ল্যান্টের খোলা প্রাঙ্গণেই স্তূপ হয়ে জমে থাকছে।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্ল্যান্ট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান দ্য স্কেট লিমিটেডের সিইও নাহিদ আলম বলেন, “নানা জটিলতার কারণে প্ল্যান্টটির কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখানে জৈব সার উৎপাদন করা হলেও তা সঠিকভাবে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্ল্যান্ট পরিচালনায় নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “পৌরসভার অসহযোগিতার কারণে এসিআইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির নির্ধারিত চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।”

অন্যদিকে, যশোরের পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান জানান, প্ল্যান্ট পরিচালনায় কিছু অনিয়মের বিষয় নজরে এসেছে এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী, তাদের নিজেদের লোকবল দিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি তা করতে পারেনি। এ বিষয়ে তাদের একাধিকবার বলা হলেও এখনও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কার্যক্রম নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।”

সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম যশোরের এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। প্ল্যান্টের চরম অব্যবস্থাপনা ও স্থবির কার্যক্রম দেখে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্ল্যান্টটি যেভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে সেভাবে কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করব প্ল্যান্টটি থেকে দ্রুত সুফল নিয়ে আসার জন্য।”