পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই সচ্ছলতা এবং রিজিকের সন্ধানে নিরন্তর ছুটে বেড়ায়। তবে কেবল প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেই জীবনে শান্তি বা ‘বরকত’ আসে না। বরকত হলো এমন এক বিশেষ অবস্থা, যেখানে অল্প সম্পদেও পর্যাপ্ত কল্যাণ ও প্রশান্তি লাভ করা সম্ভব হয়, আর এই বরকত কেবল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতকে এমন কিছু আমলের কথা শিখিয়েছেন, যা দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত অনুশীলন করলে আয়-উপার্জনে বিশেষ বরকত ও প্রাচুর্য নেমে আসে। নিচে আয়-উপার্জনে বরকত লাভের ৫টি পরীক্ষিত আমল বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। রক্তের সম্পর্ক বা আত্মীয়তার বন্ধন (সিলাতুর রাহিম) অটুট রাখা রিজিক প্রশস্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্তমান সময়ে ব্যস্ততার অজুহাতে আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর না নেওয়া বা সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্পদ ও আয়ু থেকে বরকত নষ্ট হওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৬৭)
দ্বিতীয়ত, সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। কর্মক্ষেত্রে কোনো প্রকার ফাঁকিবাজি না করা এবং ব্যবসায় পণ্যের দোষ-গুণ ক্রেতার কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো বরকতের মূল চাবিকাঠি। মিথ্যার আশ্রয় নিলে সাময়িকভাবে লাভ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের মূল বরকত নষ্ট হয়ে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই যতক্ষণ বিচ্ছিন্ন না হয়, ততক্ষণ তাদের চুক্তি বাতিলের অধিকার থাকে। যদি তারা সত্য কথা বলে এবং পণ্যের দোষ-গুণ স্পষ্ট করে দেয়, তবে তাদের কেনাবেচায় বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের ব্যবসার বরকত মুছে ফেলা হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৯)
তৃতীয়ত, ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। মানুষের নানাবিধ পাপের কারণে অনেক সময় রিজিক সংকুচিত হয়ে যায়। এর বিপরীতে ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে রিজিকের বন্ধ দরজা খুলে যায়। নবী নুহ (আ.)-এর ভাষায় কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)। এছাড়া হাদিসেও উল্লেখ আছে যে, যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে নিজের জন্য অপরিহার্য করে নেয়, আল্লাহ তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিজিক দান করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৮)
চতুর্থত, দান-সদকার অভ্যাস করা। সাধারণ জাগতিক হিসাব বলে, দান করলে সম্পদ কমে যায়। কিন্তু ইসলামের হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন; দান করলে সম্পদে বরকত আসে এবং তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে কোনো মানুষের সম্পদ কমে না..।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)। হালাল উপার্জন থেকে গরিব ও অসহায়দের সাহায্য করলে আল্লাহ ওই সম্পদের হেফাজত করেন।
পঞ্চমত, সকালের কাজে মনোযোগী হওয়া। ভোরের স্নিগ্ধতায় এবং সকালের কাজে আল্লাহ তাআলা বিশেষ বরকত রেখেছেন। অলসতা করে বেলা পর্যন্ত ঘুমালে মানুষ সেই বিশেষ বরকত থেকে বঞ্চিত হয়। মহানবী (সা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য তাদের সকাল বেলার কাজে বরকত দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)। এই হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবি সাখর আল-গামিদি (রা.) নিজে একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি নবীজির এই দোয়ার ওপর আমল করে তাঁর ব্যবসায়িক পণ্য সকাল সকাল পাঠিয়ে দিতেন, যার ফলে তিনি প্রচুর সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, আয়-উপার্জন কেবল একটি জাগতিক কাজ নয়; বরং হালাল উপায়ে রিজিক অন্বেষণ করাও একটি বড় ইবাদত। উপরোক্ত আমলগুলোর পাশাপাশি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখলে অল্প আয়েও জীবনে অভাবনীয় প্রশান্তি নেমে আসে।