অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান দখলের পর এবার বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ঘরের মাঠে আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দল ঘোষণা করেছে প্রোটিয়ারা। ১৫ সদস্যের এই স্কোয়াডে রাখা হয়েছে ছয়জন পেস বোলিং বিকল্প। চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছেন গতি বিশেষজ্ঞ আনরিখ নর্কিয়া এবং টপ অর্ডার ব্যাটার টনি ডি জর্জি। পাশাপাশি দলে জায়গা করে নিয়েছেন জুবায়ের হামজা। তবে এই দলে জায়গা পাননি ডেভিড বেডিংহাম, কাইল ভেরাইনে ও জেরাল্ড কোয়েৎজির মতো ক্রিকেটাররা।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশের বিপক্ষে এই দুই টেস্টের জন্য দল ঘোষণা করে। সিরিজের প্রথম টেস্ট শুরু হবে আগামী ১৫ নভেম্বর জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামে। এরপর ২৩ নভেম্বর সেঞ্চুরিয়নের সুপারস্পোর্ট পার্কে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় ও শেষ ম্যাচটি। উভয় টেস্টেই দক্ষিণ আফ্রিকা দলের নেতৃত্ব দেবেন টেম্বা বাভুমা।
দল নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পেস বোলিং বিভাগের ওপর। কাগিসো রাবাদা ও মার্কো ইয়ানসেনের সাথে দলে ফিরেছেন আনরিখ নর্কিয়া। তাদের পাশাপাশি স্কোয়াডে রয়েছেন ডেন প্যাটারসন, করবিন বশ ও উইয়ান মুল্ডার। সব মিলিয়ে মোট ছয়টি পেস বোলিং বিকল্প হাতে থাকছে দক্ষিণ আফ্রিকার।
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে খেলেছিলেন নর্কিয়া। তবে সেন্ট জর্জেস পার্কে দ্বিতীয় টেস্ট চলাকালীন কুঁচকির চোটে পড়েন এই গতিতারকা। প্রথম ইনিংসে মাত্র ৩ দশমিক ৩ ওভার বোলিং করার পর তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। চোটের কারণে শেষ টেস্টেও তিনি অংশ নিতে পারেননি।
প্রায় দুই সপ্তাহের পুনর্বাসনের পর এখন সুস্থ হয়ে উঠেছেন নর্কিয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের দলে তার প্রত্যাবর্তন প্রোটিয়াদের পেস আক্রমণকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে অভিজ্ঞ পেসার লুঙ্গি এনগিডিকে এখনো পাচ্ছে না দক্ষিণ আফ্রিকা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠায় তাকে নির্বাচনের জন্য বিবেচনা করা হয়নি।
ছয়জন পেসার রাখার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে সিরিজের দুই ভেন্যুর কন্ডিশন। জোহানেসবার্গ ও সেঞ্চুরিয়ন সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তুলনামূলক অনেক উঁচুতে অবস্থিত। হাইভেল্ড অঞ্চলের এই দুই মাঠের উইকেটে সাধারণত বাড়তি গতি ও বাউন্স পাওয়া যায়, ফলে সেখানে পেসারদের কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান কোচ শুকরি কনরাডও দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, হাইভেল্ডের উইকেটে সাধারণত পেস ও বাউন্স থাকে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ওয়ান্ডারার্সে স্পিনারদেরও কিছুটা সুবিধা পেতে দেখা গেছে। এসব বিবেচনায়ই পেস বোলিংয়ের বিকল্প বাড়ানো হয়েছে।
তবে নিজেদের পেস আক্রমণ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হলেও বাংলাদেশের বোলারদের হালকাভাবে নিচ্ছেন না কনরাড। তার বিশ্বাস, দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে বাংলাদেশের পেসাররাও যথেষ্ট বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন।
কনরাড বলেন, “বাংলাদেশ কতটা বিপজ্জনক দল হতে পারে, তা আমরা জানি। হাইভেল্ডের কন্ডিশনে তাদের পেসাররাও কার্যকর হবে বলে আমাদের ধারণা।”
বোলিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটিং বিভাগেও পরিবর্তন এনেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে দলে ফিরেছেন টনি ডি জর্জি। গত সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে চোট পাওয়ার পর তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে খেলতে পারেননি এই বাঁহাতি ব্যাটার।
ডি জর্জির ফেরায় দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডারের সমন্বয়েও পরিবর্তন আসতে পারে। এইডেন মার্করামের সঙ্গে তাকে ইনিংস শুরু করতে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওপেন করা মার্কেস অ্যাকারম্যানকে তিন নম্বরে নামানো হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সিরিজে প্রথমবার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ওপেন করতে নেমেছিলেন অ্যাকারম্যান। নতুন দায়িত্বে মোটামুটি সফলও হন তিনি। বিশেষ করে কেপটাউনে সিরিজের শেষ টেস্টে দুই ইনিংসেই ফিফটি করে দলের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
অন্যদিকে অতিরিক্ত ব্যাটার হিসেবে দলে ফিরেছেন জুবায়ের হামজা। ৩১ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন ২০২৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘরোয়া ক্রিকেট এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের হয়ে ভালো পারফরম্যান্স করেছেন তিনি।
চলতি বছর বাংলাদেশ ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির সিরিজেও ব্যাট হাতে কার্যকর ছিলেন হামজা। দুই ইনিংসে ৭৮ ও ৬৮ রান করে নির্বাচকদের নজর কাড়েন তিনি। তার অন্তর্ভুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডারে বাড়তি বিকল্প তৈরি হয়েছে।
তবে জায়গা হারিয়েছেন ডেভিড বেডিংহাম। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারাবাহিকতা দেখাতে পারেননি এই ব্যাটার। ফলে বাংলাদেশের বিপক্ষে স্কোয়াডে তাকে রাখা হয়নি।
দলে নেই উইকেটকিপার-ব্যাটার কাইল ভেরাইনেও। অস্ট্রেলিয়া সিরিজে একাদশে জায়গা হারানো এই ক্রিকেটারকে নতুন করে সুযোগ দেননি নির্বাচকেরা। মূল উইকেটকিপার হিসেবে থাকছেন রায়ান রিকেলটন। তার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে ম্যাথু ব্রিটজকেকে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া সিরিজের বিস্তৃত স্কোয়াডে থাকা জেরাল্ড কোয়েৎজি, ট্রিস্টান স্টাবস ও সেনরুয়ান মুতুসামিও বাংলাদেশের বিপক্ষে দলে জায়গা পাননি।
পেসারদের পাশাপাশি দুজন বিশেষজ্ঞ স্পিনারও রেখেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তারা হলেন কেশব মহারাজ ও সাইমন হারমার। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ দুটি টেস্টে খেলেছেন হারমার। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই স্পিনারের মধ্যে কে একাদশে সুযোগ পাবেন, তা নির্ভর করবে উইকেটের ধরন ও দলের সমন্বয়ের ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার কাছে প্রথম টেস্ট হারলেও পরের দুটি ম্যাচ জিতে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে প্রোটিয়ারা। সেই সাফল্যে অস্ট্রেলিয়াকে সরিয়ে আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানেও উঠেছে তারা।
বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই জয়ের ধারা ধরে রাখতে চান কনরাড। তবে প্রতিপক্ষকে নিয়ে সতর্ক থাকছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ। বিশেষ করে গত আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট জয়ের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
কনরাড জানিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের ইতিবাচক দিকগুলো ধরে রেখে দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা করবে দল। প্রথম টেস্টের আগে প্রস্তুতির সময়টুকু কাজে লাগিয়ে কন্ডিশন অনুযায়ী সেরা একাদশ নির্ধারণ করা হবে।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রেও ভালো অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তারা। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে মিরপুর টেস্টে হেরে ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে পঞ্চম স্থানে নেমেছে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দুই দলের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ হয়েছিল ২০২২ সালে। সেবার বাংলাদেশকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়েছিল স্বাগতিকরা।
আগামী ১১ নভেম্বর জোহানেসবার্গে অনুশীলন ক্যাম্প শুরু করবে দক্ষিণ আফ্রিকা। চার দিন পর সেখানেই প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে তারা। অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বিশ্বসেরা হয়ে ওঠা প্রোটিয়াদের বিপক্ষে এবার কঠিন পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।
দক্ষিণ আফ্রিকার টেস্ট দল: টেম্বা বাভুমা (অধিনায়ক), মার্কেস অ্যাকারম্যান, ম্যাথু ব্রিটজকে, করবিন বশ, টনি ডি জর্জি, সাইমন হারমার, জুবায়ের হামজা, মার্কো ইয়ানসেন, কেশব মহারাজ, এইডেন মার্করাম, উইয়ান মুল্ডার, আনরিখ নর্কিয়া, ডেন প্যাটারসন, কাগিসো রাবাদা ও রায়ান রিকেলটন।