পঞ্চগড়ে এক কিশোরীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করে রেললাইনে ফেলে রাখার অপরাধে রিফাত বিন সাজ্জাদ (২৪) নামের এক তরুণের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে।
আজ সোমবার দুপুরে পঞ্চগড় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) হুসাইন মুহাম্মদ ফজলুল বারী এই দণ্ডাদেশ ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পঞ্চগড় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) খলিলুর রহমান।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রিফাত বিন সাজ্জাদ পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
আদালত ও মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি সকালে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের কিসমত রেলস্টেশনের পাশে মালিগাঁও রেলঘুমটি এলাকায় রেলপথের ওপর থেকে পুলিশ এক অজ্ঞাতনামা নারীর খণ্ডবিখণ্ড লাশ উদ্ধার করে।
লাশ উদ্ধারের পর দিনাজপুর রেলওয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর ঠাকুরগাঁও জেলার ভূল্লী উপজেলার নিখোঁজ ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর স্বজনরা লাশটিকে শনাক্ত করেন।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ৮ মার্চ সকালে আটোয়ারী উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের কিসমত রেলগেট-সংলগ্ন হাজী শাহার আলী উচ্চবিদ্যালয় মাঠ থেকে চুরি হওয়া একটি ইজিবাইকসহ রিফাত বিন সাজ্জাদ নামের এক তরুণকে স্থানীয় লোকজন আটোয়ারী থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ রিফাতকে আটক করার পর তার স্মার্টফোনে কিছু নগ্ন ছবি ও আপত্তিকর ভিডিও দেখতে পায়, যা পুলিশের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে একপর্যায়ে রিফাত স্বীকার করেন যে, ১৪ জানুয়ারি রেললাইনের ওপর যে কিশোরীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল, তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছিলেন তিনি। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বাদী হয়ে আটোয়ারী থানায় রিফাত বিন সাজ্জাদের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে রিফাত বিন সাজ্জাদ আদালতে তার অপরাধ স্বীকার করে একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও প্রদান করেন।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে রিফাত জানান, ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে দিনাজপুর থেকে পঞ্চগড়ের দিকে যাচ্ছিলেন। সেই সময় ঠাকুরগাঁও রোড রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেনের ভেতর এক অজ্ঞাতনামা কিশোরীকে দেখে তার সঙ্গে কথা বলেন রিফাত। এরপর বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রাত ৯টার দিকে পঞ্চগড়ের কিসমত রেলস্টেশনে মেয়েটিকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেন থেকে নামেন তিনি। এরপর মেয়েটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন রিফাত। ধর্ষণের পর দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হলে একপর্যায়ে একটি ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে মেয়েটিকে হত্যা করেন তিনি। ভোরে মেয়েটির লাশ টেনেহিঁচড়ে রেললাইনের ওপর ফেলে রেখে চলে যান রিফাত। পরবর্তীতে রাজশাহী থেকে পঞ্চগড়গামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে পড়ে লাশটি খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়।
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আটোয়ারী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জহুরুল ইসলাম ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট রিফাত বিন সাজ্জাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় মোট ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণের পর বিচারক এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।