প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের দাম এক ধাক্কায় বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ৭৬ টাকা নির্ধারণ করেছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড। অথচ সারা দেশে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের নির্ধারিত দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা। অর্থাৎ জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের তুলনায় সেন্টমার্টিনে এই দাম প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। গতকাল ১ নভেম্বর থেকে নতুন এই মূল্যহার কার্যকর করা হয়েছে।
বিদ্যুতের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, এত চড়া দাম দিয়েও দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। এরই মধ্যে আজ সোমবার (২ নভেম্বর) বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ উন্মুক্ত করেছে সরকার। আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপটিতে যেতে পারবেন। পর্যটন মৌসুম শুরুর দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে বিদ্যুতের এই নতুন মূল্যহার।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্যহার অনুযায়ী, সারা দেশে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ৭৫ ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। পরবর্তী ধাপগুলোতে এই দাম ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। আর বাণিজ্যিক ও অফিসের গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা।
অন্যদিকে, সেন্টমার্টিনে আগে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৬৬ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৬৫ ও ৭৬ টাকা।
জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে থাকা সেন্টমার্টিনে একসময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। পরে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি চালু হয় ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। দ্বীপবাসী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিন-রাত বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় স্থাপন করা হয় ৯২৫টি সোলার প্যানেল। পাশাপাশি ৪৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটির মাধ্যমে দ্বীপে প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থায়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।
সেন্টমার্টিন জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে হওয়ায় সেখানে বিইআরসি নির্ধারিত সাধারণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক বিদ্যুতের মূল্যহার প্রযোজ্য নয়। বিদ্যুৎ বিভাগের ২০১৩ সালের সৌর মিনি-গ্রিড নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিচ্ছিন্ন এলাকায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রকল্প চালুর পর শুরুর দিকে বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। তখন আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ৪২ টাকা। ২০২২ সালের জুনে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য পাঁচ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়। এরপর বিদ্যুৎ সরবরাহ কমতে থাকে। ২০২৩ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে ইউনিটপ্রতি দাম আরও ১০ টাকা বাড়ায় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাতেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে গ্রাহকদের না জানিয়েই কয়েক দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে।
তাদের আরও অভিযোগ, বিদ্যুতের বিল রিচার্জের সময় বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে রাখা হয়। এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়। কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তারও স্পষ্ট হিসাব দেওয়া হয় না। ফলে প্রকৃতপক্ষে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত পড়ছে, তা বুঝতে পারছেন না গ্রাহকেরা।
সেন্টমার্টিনের ব্যবসায়ী মৌলভী আবু তাহের বলেন, “এ দ্বীপে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। ১৯৯১ সালের পর থেকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্ষায় আমাদের অন্ধকারে থাকতে হয়েছে। মাঝখানে সরকারের সহায়তায় ইডকলের মাধ্যমে নানা সময়ে বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু এখন আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে কিছু ব্যবসায়িক কালো আইন।”
মৌলভী আবু তাহের আরও বলেন, “বর্তমানে দ্বীপের সোলার প্যানেলের বিদ্যুতের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭৪ থেকে ৮২ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। এ ব্যয় স্থানীয়দের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের অংশ হিসেবে আমরও সরকারিভাবে বিদ্যুৎ চাই।”
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছৈয়দ আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রথম দুই বছর ঠিকমতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। বাকি সময় সরবরাহ বন্ধ থাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে দ্বীপের মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছেন।”
ছৈয়দ আলম বলেন, “সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে আমরা স্বাগত জানাবো। কোনো বাসিন্দা কিংবা ব্যবসায়ী ইউনিটপ্রতি ৭৪ টাকা বিদ্যুতের বিল মেনে নেবে না।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারিভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে দ্বীপে ক্যাবল স্থাপন করে বিদ্যুৎ আনা হোক। যাদের স্থাপনা রয়েছে, তাদের ছাদ ব্যবহার করে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।”
ইউপি চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিদ্যুতের সংকটের বিষয়টি আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। কিছুদিন আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছিল। ওই বৈঠকে আমরা জানিয়ে দিয়েছিলাম, বাড়তি দামে আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই। প্রতিষ্ঠান চাইলে তাদের বিদ্যুৎ নিয়ে যেতে পারে। আমরা দ্বীপবাসীর সুবিধার্থে সরকারিভাবে পিডিবির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি করছি।”
ফয়েজুল ইসলাম বলেন, “ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ বিষয়ে আগামীকাল মঙ্গলবার স্থানীয় বাসিন্দা ও অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করবো। এরপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দ্বীপবাসীর প্রতিনিধি হিসেবে আমি প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ বয়কটের ঘোষণা দিচ্ছি।”
জানতে চাইলে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সেন্টমার্টিন কার্যালয়ের প্রকৌশলী মোহাম্মদ শিহাব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রকল্পটি স্থাপনের সময় বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম ছিল। এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রবেশ করায় চাহিদা বেড়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া পর্যটন মৌসুমে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা করছে কোম্পানি। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চেয়ে সোমবার বিকেলে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, “প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।” এ কথা বলেই তিনি ফোন কেটে দেন।
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের পক্ষ থেকে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দাম বাড়ানো হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল। কিন্তু এর বাইরে আর কিছু জানানো হয়নি। তারা স্থানীয়দের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছিলেন। বিষয়টি আমরা দেখছি।”