দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ হারের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই বড় ধরনের রদবদল করল অস্ট্রেলিয়া। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ডের সাথে আসন্ন ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য ঘোষিত দল থেকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জশ হ্যাজলউডকে। অভিজ্ঞ এই তিন পেসারের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেয়েছেন একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার। দুই সংস্করণেই দলের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পালন করবেন মিচেল মার্শ। মূলত ঠাসা আন্তর্জাতিক সূচি এবং সামনে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজের কথা মাথায় রেখেই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে এবং পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য পৃথক ১৪ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে অস্ট্রেলিয়া। আগামী ১৩ নভেম্বর পার্থে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচের মাধ্যমে শুরু হবে দুই দলের লড়াই। এরপর ২১ নভেম্বর থেকে শুরু হবে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ। সব মিলিয়ে আট ম্যাচের এই সিরিজটি শেষ হবে ২ ডিসেম্বর।

অস্ট্রেলিয়ার দল ঘোষণায় সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা যাচ্ছে অভিজ্ঞ তিন পেসারের অনুপস্থিতিকে। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে অংশ নিয়েছিলেন কামিন্স, স্টার্ক ও হ্যাজলউড। তবে সেই সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হেরে টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানটি হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। সেই কঠিন সফরের পর তিন তারকা পেসারকেই বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নির্বাচকরা।

উল্লেখ্য, মিচেল স্টার্ক আগেই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন। ফলে তার ক্ষেত্রে বিশ্রামের সিদ্ধান্তটি কেবল ওয়ানডে সিরিজের জন্য প্রযোজ্য। অন্যদিকে, প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউড দুই সংস্করণের কোনো ম্যাচেই অংশ নেবেন না।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার সামনের ব্যস্ত টেস্ট সূচি। আগামী ৯ ডিসেম্বর পার্থে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু হবে চার ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। এরপর ভারতে পাঁচ ম্যাচের বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফি খেলতে যাবে অস্ট্রেলিয়া দল। সব মিলিয়ে ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া পরবর্তী কয়েক মাসে মোট দশটি টেস্ট খেলার কথা রয়েছে তাদের।

দল ঘোষণার পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাচক জর্জ বেইলি জানান, ক্রিকেটারদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সতেজ রাখাই এখন তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। বিশেষ করে যারা তিন সংস্করণেই খেলছেন, তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

বেইলি বলেন, ‘আমরা এখন অত্যন্ত ব্যস্ত একটি সূচির মধ্যে আছি। দক্ষিণ আফ্রিকা সফর শেষে ক্রিকেটারদের সরাসরি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলতে হচ্ছে। এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় খুবই সীমিত।’

অভিজ্ঞদের বিশ্রামের সুযোগে তরুণ ক্রিকেটারদের সামনে নিজেদের প্রমাণের বড় মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডে দলে সুযোগ পেয়েছেন ২১ বছর বয়সী পেসার মাহলি বেয়ার্ডম্যান, ২০ বছর বয়সী ব্যাটার অলিভার পিক এবং অলরাউন্ডার জ্যাক এডওয়ার্ডস ও লিয়াম স্কট।

বেয়ার্ডম্যানকে অস্ট্রেলিয়ার ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেসার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হলেও পিঠের স্ট্রেস ফ্র্যাকচারের কারণে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। তবে চোট কাটিয়ে ফিরে গত অক্টোবরে ভারতে অস্ট্রেলিয়া 'এ' দলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন তিনি।

পুদুচেরিতে এক ম্যাচে মাত্র ২৩ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন এই তরুণ পেসার। এমন নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর তাকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি উভয় দলেই রেখেছেন নির্বাচকরা।

বেয়ার্ডম্যানকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রধান নির্বাচক বেইলি। তার মতে, তরুণ এই পেসার ভবিষ্যতে তিন সংস্করণেই অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হয়ে উঠতে পারেন।

বেইলি বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া এ দলের হয়ে বেয়ার্ডম্যানের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দলে তাকে ফিরে পেয়ে আমরা আনন্দিত। আগামী বছরগুলোতে তিন সংস্করণের ক্রিকেটার হিসেবে তার উন্নতির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।’

ওয়ানডে দলে জায়গা পাওয়া অলিভার পিকও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটারদের একজন। গত শীত মৌসুমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া এই ব্যাটার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এক ম্যাচের শেষ ওভারে ২৪ রান তুলে নির্বাচকদের নজর কেড়েছিলেন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে এক ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন জ্যাক এডওয়ার্ডস।

ওয়ানডে দলে অভিজ্ঞ ব্যাটারদের মধ্যে রয়েছেন ট্রাভিস হেড, ক্যামেরন গ্রিন, অ্যালেক্স ক্যারি, জশ ইংলিস, ম্যাথু রেনশ ও কুপার কনোলি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে খেলা এই ছয় ক্রিকেটারকে টি-টোয়েন্টি সিরিজ থেকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে।

ফলে টি-টোয়েন্টি দলে পরিবর্তন আরও বেশি লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো সুযোগ পেয়েছেন উইকেটকিপার-ব্যাটার ল্যাকলান শ ও স্যাম হার্পার। ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেয়েছেন এই দুজন।

বিশেষ করে হার্পারের সাম্প্রতিক ফর্ম নির্বাচকদের সন্তুষ্ট করেছে। গত মৌসুমে বিগ ব্যাশ লিগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে ল্যাকলান শ-এর।

এ ছাড়া টি-টোয়েন্টি দলে ফিরেছেন আক্রমণাত্মক ব্যাটার জ্যাক ফ্রেজার-ম্যাকগার্ক ও মিচেল ওয়েন। প্রায় দেড় বছর পর অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি দলে জায়গা পেয়েছেন ফ্রেজার-ম্যাকগার্ক। তাদের আগ্রাসী ব্যাটিং সামর্থ্য সংক্ষিপ্ত সংস্করণে দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করেন বেইলি।

পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি দলে রয়েছেন নিখিল চৌধুরী, জোয়েল ডেভিস ও টিম ডেভিড। নাথান এলিসও আছেন এই দলে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গত সেপ্টেম্বরে পাওয়া পাজরের পাশের পেশির চোট থেকে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকায় ওয়ানডে সিরিজে খেলবেন না তিনি। তবে টি-টোয়েন্টিতে তার ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।

দুই সংস্করণের দলেই অভিজ্ঞ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পাকে রাখা হয়েছে। পেস আক্রমণে বেয়ার্ডম্যানের পাশাপাশি থাকছেন স্পেন্সার জনসন ও জেভিয়ার বার্টলেট।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে ১৩ নভেম্বর পার্থে। পরের দুটি ম্যাচ ১৫ নভেম্বর অ্যাডিলেড ও ১৮ নভেম্বর হোবার্টে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ২১ নভেম্বর মেলবোর্নে শুরু হবে টি-টোয়েন্টি সিরিজ। বাকি চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে গোল্ড কোস্ট, ব্রিসবেন, সিডনি ও ক্যানবেরায়।

অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে দল: মিচেল মার্শ (অধিনায়ক), জেভিয়ার বার্টলেট, মাহলি বেয়ার্ডম্যান, অ্যালেক্স ক্যারি, কুপার কনোলি, জ্যাক এডওয়ার্ডস, ক্যামেরন গ্রিন, ট্রাভিস হেড, জশ ইংলিস, স্পেন্সার জনসন, অলিভার পিক, ম্যাথু রেনশ, লিয়াম স্কট ও অ্যাডাম জাম্পা।

অস্ট্রেলিয়ার টি-টোয়েন্টি দল: মিচেল মার্শ (অধিনায়ক), জেভিয়ার বার্টলেট, মাহলি বেয়ার্ডম্যান, নিখিল চৌধুরী, টিম ডেভিড, জোয়েল ডেভিস, জ্যাক এডওয়ার্ডস, নাথান এলিস, জ্যাক ফ্রেজার-ম্যাকগার্ক, স্যাম হার্পার, স্পেন্সার জনসন, মিচেল ওয়েন, ল্যাকলান শ ও অ্যাডাম জাম্পা।