ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বেশ কিছু দাবি জানিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলা এই বিক্ষোভ ও অবরোধের পর অবশেষে সড়কটি ছেড়েছেন তারা।

সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দফায় দফায় এই অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার আশ্বাসে শ্রমিকেরা তাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। দীর্ঘ সময় যানচলাচল বন্ধ থাকার পর ধীরে ধীরে সড়কটিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসতে শুরু করে।

শ্রমিকদের এই আকস্মিক অবরোধের ফলে দিনভর ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট, জালকুড়ি, ভুইগড় ও সাইনবোর্ড এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় যাত্রী, পথচারী এবং কর্মজীবী মানুষের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে, যখন ফতুল্লার কুতুবাইল ও কাঠেরপুল এলাকার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে একে একে সড়কে জড়ো হতে থাকেন। এরপর বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে অবস্থান নেন এবং দুপুর ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক অবরোধ শুরু করেন। প্রথমে শিবু মার্কেট ও কাঠেরপুল এলাকার প্রায় ২০টি ছোট-বড় কারখানার শ্রমিকেরা শিবু মার্কেট এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে মিছিল নিয়ে সাইনবোর্ডের দিকে অগ্রসর হন।

আন্দোলনটি দ্রুত লিংক রোডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা পৃথক পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে শিবু মার্কেট থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত অবস্থান নেন এবং যানচলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এসময় তারা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন।

বিক্ষোভ চলাকালীন ভুইগড়ের নিকটবর্তী এসবি গার্মেন্টসের শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। তবে কারখানা কর্তৃপক্ষ এতে আপত্তি জানালে সেখানে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও কাচ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির অবনতি হতে দেখে পরবর্তীতে কারখানাটি ছুটি ঘোষণা করা হয়।

বেলা আড়াইটার দিকে ভুইগড় মোড়ে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা অবস্থান নেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে শ্রমিকদের মুখোমুখি উত্তেজনার মধ্যেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে উভয় পক্ষ সাময়িকভাবে সড়ক থেকে সরে যান। বৃষ্টি থামার পর প্রশাসন পুনরায় শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে অবরোধ প্রত্যাহারের চেষ্টা চালায় এবং শেষ পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে দেন।

বিকেলের দিকে শিবু মার্কেট এলাকায় পুনরায় জড়ো হওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। এসময় সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি বিবেচনা করার এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সমাধান আনার আশ্বাস দেওয়া হয়। প্রশাসনের এই আশ্বাসে বিকেল ৫টার দিকে শ্রমিকেরা শিবু মার্কেট এলাকা থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে সড়ক ছেড়ে যান এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সেখানে শ্রমিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাদের দাবিগুলো উপস্থাপন করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় মতামত দেওয়া হবে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি যৌক্তিক সমাধান আসবে বলে আমরা আশাবাদী। সরকার তার সামর্থ্য অনুযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করেই বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিকদের ধৈর্য ধরার জন্য আমরা আশ্বস্ত করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকেরা সড়কে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছিলেন। পরে পুলিশ সুপার, সংসদ সদস্যসহ আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ঘণ্টা তাদের কর্মসূচি চলে। বর্তমানে সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।”

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন কোথাও কোনো অবরোধ নেই। যানবাহন চলাচল শুরু হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই যানজট কমে সড়কের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। অবরোধ চলাকালে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে আসেনি। সড়কে অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিলো।”