ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের শূন্য পদে দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক নারী সদস্যের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পরিষদের সচিবসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে। টাকা নেওয়ার তিন মাস পার হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় ওই নারী সদস্য টাকা ফেরত চাইলে বিষয়টি নিয়ে একটি সালিশি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেই বৈঠকে টাকা লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। পরবর্তীতে বৈঠকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এরই মধ্যে প্রমাণ লোপাট করতে ইউনিয়ন পরিষদের রেজুলেশন বই সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সচিবের বিরুদ্ধে।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদে এই ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় এক গ্রাম পুলিশকে হাতেনাতে ধরার পর পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

অভিযোগকারী হোসনেয়ারা কামারপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য এবং প্যানেল চেয়ারম্যান। স্থানীয় বিএনপি নেতা, ইউপি সদস্য এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সালিশি বৈঠকে তিনি অভিযোগ করেন যে, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিষদের সচিবসহ ছয়জন তার কাছ থেকে মোট দেড় লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন।

হোসনেয়ারার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোকছেদুল ইসলাম নিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা, সদ্য বরখাস্ত হওয়া চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মাসুদ নিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোরসালিন ২০ হাজার টাকা, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলিম ১০ হাজার টাকা, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জলিল ১০ হাজার টাকা এবং ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য মোসলেমা ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন।

এই বিষয়ে হোসনেয়ারা বলেন, “এখন পদও নাই, টাকাও নাই। এ অবস্থায় বিভিন্নজনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হচ্ছে না।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সালিশি বৈঠকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাতের অন্ধকারে ইউনিয়ন পরিষদের রেজুলেশন বই সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন সচিব মোকছেদুল ইসলাম। এই কাজে গ্রাম পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) মানিক জানান, সচিব তাকে চাবি দিয়ে রেজুলেশন বই নিয়ে সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকারের কাছে যেতে বলেছিলেন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে যে, ওই রাতেই গোপনে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান-২ জালাল উদ্দীনকে চেয়ারম্যান করার বিষয়ে একটি রেজুলেশন তৈরি করে রোববার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জালাল উদ্দীন বলেন, “নিয়ম অনুযায়ীই আমি চেয়ারম্যান হচ্ছি। এক নম্বর প্যানেল চেয়ারম্যান আলালের বিরুদ্ধে ভিডব্লিউবি কর্মসূচির উপকারভোগীদের সঞ্চয়ের টাকা নিজের কাছে রাখার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, প্যানেল চেয়ারম্যান-৩ হোসনেয়ারার বিরুদ্ধেও ইউপি সচিবসহ বিভিন্নজনকে দেড় লাখ টাকা দিয়ে অনিয়ম করার অভিযোগ রয়েছে।”

ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, সচিব মোকছেদুল ইসলাম কামারপুকুর ইউনিয়নেরই বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে আগেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার ছেলের নামে প্রতিবন্ধী ভাতা করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তাকে একসময় জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল, তবে পরে তিনি পুনরায় নিজ ইউনিয়নে কর্মরত হন। এছাড়া অতিরিক্ত ফি আদায়সহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও তোলেন আমিনুল।

এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সচিব মোকছেদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠের প্রতিনিধিকে বলেন, “এটি মিথ্যা ঘটনা, আমি এখন চাল বিতরণ করতেছি আপনি দুপুর ২টার পর ফোন দিয়েন।”

অন্যদিকে, সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার বলেন, “চৌকিদার আমার নাম কেন বলেছে, আমি কি তাকে আসতে বলেছি, আমি এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব। ইউনিয়ন পরিষদের কোনো বিষয়েই আমার মাথাব্যথা নেই। কোনো ঘটনার সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে কেউ কিছু বললে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।”

সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারহা ফাতেহা তাকমিলা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এ ধরনের কোন লিখিত অভিযোগ এখনো পাইনি তবে বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনতে পাচ্ছি তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে তিনি কোনোভাবেই এমন কাজে জড়িত হতে পারেন না।”