বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার পথচলা শুরু হয়েছিল ছয় দশকেরও বেশি আগে। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের হাত ধরে এই প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সেই সময়ে সাংবাদিকদের প্রধান কর্মক্ষেত্র ছিল মূলত সংবাদপত্র। পরবর্তীতে রেডিও ও টেলিভিশনের প্রসার ঘটলে সাংবাদিকতার কাজের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চালু করা হয় এবং নব্বইয়ের দশকে এই শিক্ষা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
সময়ের সাথে সাথে সংবাদমাধ্যমের রূপ বদলেছে; পরিবর্তিত হয়েছে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের ধরন। বর্তমান যুগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, পডকাস্ট, ওটিটি এবং নানা ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট প্রকাশের মাধ্যম সামনে এসেছে। এমনকি বিজ্ঞাপন ও জনসংযোগের কাজগুলোও এখন অনেকাংশেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হয়েছে। বর্তমান যোগাযোগের জগতে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
মিডিয়া খাতের পরিধি এভাবে বৃদ্ধি পেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা, মিডিয়া স্টাডিজ, গণযোগাযোগ, যোগাযোগ বা চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার উচ্চশিক্ষার জন্য কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করেন, তারা সন্তানের পেশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি হিসাব-নিকাশ করেন। সাংবাদিকতা বা মিডিয়া পড়ে ভবিষ্যতে কী করা যাবে, আয় কেমন হবে কিংবা চাকরির নিশ্চয়তা কতটা—এই প্রশ্নগুলো তাদের ভাবায়। এই বাস্তবতাকে বুঝতে হলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার ইতিহাস এবং পরিবর্তিত গণমাধ্যমের দিকে একসঙ্গে তাকাতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাত্রা—
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ইতিহাসবিষয়ক প্রকাশনা অনুযায়ী, “১৯৬২ সালে এক বছরের স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্স দিয়ে এই শিক্ষার শুরু।” ১৯৭৭ সালে এই বিভাগের নাম পরিবর্তন করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ রাখা হয়। পরবর্তীতে এখানে স্নাতকোত্তর ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা চালু হয়। দীর্ঘ সময় ধরে সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে দেশের অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই শিক্ষা বিস্তার লাভ করে। ১৯৯২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নাম পরে পরিবর্তন করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা করা হয়। এরপর জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর, বেগম রোকেয়াসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের বিভাগ চালু হয়। এই বিস্তারের সাথে সাথে বিষয়টির ধরনও বদলাতে থাকে। সাংবাদিকতার সাথে গণযোগাযোগ, গণমাধ্যম, গবেষণা, বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ, চলচ্চিত্র ও উন্নয়ন যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো যুক্ত হতে থাকে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন অধ্যায়—
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ শিক্ষার এক নতুন পর্ব শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত “৫০ ইয়ার্স অব জার্নালিজম স্টাডিজ ইন বাংলাদেশ” সংকলনে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভস, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশসহ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ-সংক্রান্ত বিভাগ বিস্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টির বিস্তারের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও ঘটে। সাংবাদিকতা আর শুধু সংবাদপত্রে রিপোর্টার তৈরির বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকল না। এর সাথে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ, উন্নয়ন যোগাযোগ ও ডিজিটাল মাধ্যমও যুক্ত হলো।
সাংবাদিকতা থেকে গণমাধ্যম—
বর্তমান গণমাধ্যমের কর্মক্ষেত্র শুধু সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম, পডকাস্ট, চলচ্চিত্র, ওটিটি, বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ ও করপোরেট যোগাযোগ—এ সবই এখন বৃহত্তর গণমাধ্যম ও যোগাযোগশিল্পের অংশ। ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায়, ২০০৪ সালে তাদের মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের স্নাতক পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে মিডিয়া ল্যাব, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যবসায় সাংবাদিকতা, ডিজিটাল চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা এবং জনসংযোগের মতো বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়। এই পরিবর্তন শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, বরং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও মিডিয়া বিভাগের পাঠ্যক্রমেও ধীরে ধীরে নতুন মাধ্যম ও নতুন পেশার বিভিন্ন বিষয় যুক্ত হয়েছে।
ফলে একজন মিডিয়া শিক্ষার্থীর সামনে এখন শুধু নিউজরুম নয়; বিজ্ঞাপনী সংস্থা, জনসংযোগ, করপোরেট যোগাযোগ, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন, ডিজিটাল কনটেন্ট, উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা এবং বিভিন্ন সৃজনশীল পেশার দরজাও খোলা রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের একটি উদাহরণ—
সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়টি অফিশিয়ালি ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সূচনা করে। বিভাগের পাঠ্যক্রমে সাংবাদিকতার প্রচলিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি গ্রাফিক সাংবাদিকতা, রেডিও সাংবাদিকতা ও পডকাস্ট, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা, সামাজিক ও ডিজিটাল যোগাযোগ, যোগাযোগ গবেষণা এবং গণমাধ্যমের ব্যবসা পরিকল্পনার মতো বিষয় রয়েছে। চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি এবং টেলিভিশন সাংবাদিকতার বিষয়ও রয়েছে।
এ ধরনের পাঠ্যক্রম থেকে বোঝা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রজন্মের মিডিয়া শিক্ষা বিভাগগুলো সাংবাদিকতাকে শুধু সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের পেশা হিসেবে দেখছে না। বরং সাংবাদিকতা, যোগাযোগ, ডিজিটাল মাধ্যম, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের ব্যবসাকে একই বৃহত্তর পরিসরের মধ্যে দেখার চেষ্টা করছে। তবে একটি নতুন বিভাগ চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে একটি বিষয়কে আকর্ষণীয় করে তোলা এক বিষয় নয়। একটি বিষয়ে শিক্ষার্থীর আস্থা তৈরি করতে হলে সেই শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কও স্পষ্ট করতে হয়।
আগ্রহ আছে, কিন্তু পথ পরিষ্কার নয়—
২০২৫ সালে ‘জার্নালিজম অ্যান্ড মাস কমিউনিকেশন এডুকেটর’–এ প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪০ জন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীর ওপর একটি জরিপ করা হয়। গবেষণাটি শিক্ষার্থীদের মিডিয়া পেশায় যাওয়ার আগ্রহের পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা যে বিষয়টি পড়ছেন, সেটি উপভোগ করলে এবং আগে থেকে গণমাধ্যমের সঙ্গে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে এ বিষয়ে পড়ার আগ্রহ বাড়ে। অন্যদিকে গণমাধ্যম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলে সেই আগ্রহ কমে। একজন শিক্ষার্থী সাংবাদিকতা পড়ছেন বলেই যে তিনি শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা পেশায় যাবেন, এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর ধারণা বদলাতে পারে। একইভাবে যিনি শুরুতে সাংবাদিকতায় আগ্রহী নন, বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাঁর আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
এই জায়গা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন শিক্ষার্থী যখন কয়েক বছর ধরে উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করছেন, তখন বিষয়টির সঙ্গে সম্ভাব্য পেশার সম্পর্কটি তাঁর কাছে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
আর্থসামাজিক অবস্থানও কি ভূমিকা রাখে—
২০২৬ সালে ‘SAGE Open’-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা এ প্রশ্নকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। আগের গবেষণার সঙ্গে একই গবেষক দলের এ গবেষণায়ও ১৬টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪০ জন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষণাটির বিষয় ছিল শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক পটভূমি, ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, পেশাগত পছন্দ এবং গণমাধ্যম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে মিডিয়া পেশা বেছে নেওয়ার সম্পর্ক।
গবেষণায় পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থানের সঙ্গে মিডিয়া পেশায় আগ্রহের একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যে পরিবারের আয় বেশি, সে পরিবারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিডিয়া পেশায় আগ্রহ তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি একই সঙ্গে দেখিয়েছে, পরিবারের আয় একাই শিক্ষার্থীর পেশা নির্বাচনের প্রধান পরিমাপক নয়; শিক্ষার্থীর শিক্ষাবর্ষ, কোন ধরনের মিডিয়া পেশায় যেতে চান এবং গণমাধ্যম সম্পর্কে তার ধারণাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয় যে শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক অবস্থা তাঁর পেশাগত প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।
চাকরির বাজারের বাস্তবতা—
মিডিয়া বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের পেছনে শুধু পরিবারের ধারণা দায়ী নয়। গণমাধ্যমের কর্মপরিবেশও একটি বড় বিষয়। ২০২৬ সালের একটি গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলগুলোর একটি হলো, গণমাধ্যমের কর্মপরিবেশ ও পেশাগত বাস্তবতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা শিক্ষার্থীদের মিডিয়া পেশায় যাওয়ার আগ্রহ কমায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউনেসকো ও ইউএনডিপির এক জরিপে গণমাধ্যমের আর্থিক চাপ, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও পেশাগত নানা সমস্যার কথা উঠে এসেছে। সাংবাদিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও পেশাগত মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও সেখানে বলা হয়েছে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, এসব বিষয় মিডিয়া পেশায় যাওয়ার অনাগ্রহ থাকার সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত। ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে অনিশ্চয়তাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
একটি পরিবার যখন সন্তানের উচ্চশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করে, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইতে পারে যে পড়াশোনা শেষ করে সন্তান কী ধরনের পেশায় যাবে, সেই পেশায় আয় ও নিরাপত্তা কেমন এবং ভবিষ্যতে উন্নতির সুযোগ কতটা। এ উদ্বেগকে পুরোপুরি অমূলক বলা যায় না।
কিন্তু এখানেই আরেকটি পরিবর্তন চোখে পড়ছে। ‘মিডিয়ায় চাকরি’ এখন আর শুধু সাংবাদিকতার চাকরি নয়। একজন মিডিয়া স্নাতকসম্পন্নকারী বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতে পারেন, জনসংযোগে যেতে পারেন, করপোরেট যোগাযোগে কাজ করতে পারেন, চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন প্রযোজনায় যুক্ত হতে পারেন, উন্নয়ন সংস্থায় যোগাযোগবিষয়ক কাজ করতে পারেন, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন, গবেষণায় যেতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম কতটা বদলেছে—
এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যমের প্রযুক্তি দ্রুত বদলালেও অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সেই গতিতে বদলায়নি—এমন সমালোচনা গবেষণায় এসেছে। সাংবাদিকতা শিক্ষার ক্ষেত্রে নিউজরুমের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতির কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী যদি চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে বের হওয়ার পরও সংবাদ সংগ্রহ, ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা না পান, তাহলে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে তার দক্ষতার দূরত্ব তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এই জায়গায় শুধু নতুন কোর্স চালু করাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ভালো শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব, ব্যবহারিক কাজ, সংবাদমাধ্যম ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, ইন্টার্নশিপ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ—
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। একসময় সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীকে সংবাদ লেখা, ছবি তোলা, ভিডিও সম্পাদনা কিংবা তথ্য সংগ্রহের জন্য যে সময় দিতে হতো, প্রযুক্তির কারণে তার কিছু কাজ এখন অনেক দ্রুত করা সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা লেখা তৈরি করতে পারে, অডিও থেকে লেখা তৈরি করতে পারে, অনুবাদ করতে পারে, ছবি ও ভিডিও সম্পাদনায় সহায়তা করতে পারে।
কিন্তু এর সঙ্গে নতুন কিছু দক্ষতার প্রয়োজনও তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি তথ্য কীভাবে যাচাই করা হবে? ভুল তথ্য কীভাবে শনাক্ত করা হবে? কোনো ছবি বা ভিডিও আসল কি না, তা কীভাবে বোঝা যাবে? প্রযুক্তি ব্যবহার করার সময় সাংবাদিকতার নৈতিকতা কীভাবে বজায় থাকবে? এই প্রশ্নগুলোই ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা শিক্ষার অংশ হওয়া প্রয়োজন। কারণ, প্রযুক্তি তথ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু তথ্যের সামাজিক মূল্য, সত্যতা ও নৈতিকতা বিচার করার দায়িত্ব এখনো মানুষের।
টিকে থাকার প্রশ্নটি তাই অন্য জায়গায়—
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা, মিডিয়া, যোগাযোগ ও চলচ্চিত্র বিভাগগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো শিক্ষার্থী কম-বেশি হওয়া নয়। বরং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে এই শিক্ষার ভবিষ্যৎ কতটা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা যাচ্ছে, সেটি। একটি পরিবার যদি মনে করে সাংবাদিকতা মানেই শুধু সংবাদপত্রে রিপোর্টার হওয়া, তাহলে তারা হয়তো বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী হবে না। কিন্তু যদি তারা জানেন, এই শিক্ষার মাধ্যমে সাংবাদিকতার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, জনসংযোগ, করপোরেট যোগাযোগ, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, ডিজিটাল কনটেন্ট, গবেষণা ও নতুন ধরনের যোগাযোগ পেশায় যাওয়ার সুযোগ আছে, তাহলে বিষয়টি অন্যভাবে দেখা সম্ভব।
তবে এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও নিজেদের বদলাতে হবে। শুধু বিভাগের নামের সঙ্গে ‘মিডিয়া’ বা ‘ডিজিটাল’ শব্দ যুক্ত করলেই হবে না। শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মৌলিক মূল্যবোধ, তথ্য যাচাই, নির্ভুলতা, নৈতিকতা, জনস্বার্থ ও দায়িত্বশীলতা—এ ব্যাপারগুলো অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
ছয় দশক পর নতুন সংজ্ঞা—
১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা শিক্ষা শুরু হওয়ার সময় যে কর্মজগতের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা হতো, তার সঙ্গে আজকের কর্মজগতের অনেক পার্থক্য। তখন সংবাদপত্র ও রেডিও ছিল প্রধান মাধ্যম। পরে টেলিভিশন এসেছে। এরপর অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, পডকাস্ট, ওটিটি এবং এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে গণমাধ্যমের কাজের ধরন বদলেছে। বদলেছে মিডিয়া শিক্ষার প্রয়োজনও। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া পড়তে শিক্ষার্থীরা কেন আগ্রহী হবে—এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘চাকরি হবে কি না’ দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হবে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের সম্পর্কের মধ্যে। যে বিভাগ শুধু পুরোনো সাংবাদিকতার জন্য শিক্ষার্থী তৈরি করবে, তার এ বিভাগের প্রতি আগ্রহ কমতে পারে। আর যে বিভাগ সাংবাদিকতার মূল শিক্ষা ধরে রেখে নতুন গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র, যোগাযোগ, বিজ্ঞাপন, গবেষণা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে, তার সামনে নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার বয়স ছয় দশকের বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই শিক্ষার বয়সও এখন কয়েক দশকের। ফলে এখন আর প্রশ্নটি শুধু নতুন বিভাগ খোলার নয়, প্রশ্নটি হলো, পরিবর্তিত গণমাধ্যমের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন মানুষ তৈরি করবে? সম্ভবত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া বিভাগগুলোর টিকে থাকার লড়াই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী পাওয়ার লড়াই নয়। এটি নিজেদের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে প্রমাণ করার লড়াই, সেটি শিক্ষার্থীর কাছে, পরিবারের কাছে এবং বদলে যাওয়া গণমাধ্যমশিল্পের কাছে।
*লেখক: কাজী কামরুন নাহার তানিয়া, শিক্ষক ও গবেষক, মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা