তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে মানবচুল ও উইগ শিল্প। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত চুল প্রক্রিয়াজাত করে এবং তা দিয়ে উইগ তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই খাতের রপ্তানি আয়ে লক্ষ্য করা গেছে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেওয়া তথ্যানুসারে, এই চার মাসে মানবচুল ও উইগ রপ্তানির মাধ্যমে বাংলাদেশ মোট ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অংকটি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৩০ লাখ টাকারও বেশি। উল্লেখ্য যে, গত অর্থবছরের একই সময়ে এই খাত থেকে অর্জিত আয় ছিল ৫ কোটি ডলার। ফলে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এই শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বেশ বিস্তৃত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাড়ি বাড়ি ঘুরে, স্থানীয় নাপিতের দোকান এবং সংগ্রাহকদের কাছ থেকে চুল সংগ্রহ করেন ব্যবসায়ীরা। সংগৃহীত চুলগুলোকে পরবর্তীতে দৈর্ঘ্য এবং গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর এই চুলগুলো হয় কাঁচামাল হিসেবে সরাসরি বিদেশে পাঠানো হয়, অথবা দেশে উইগ তৈরির কারখানায় ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশি মানবচুলের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে পরিচিত চীন। চীন থেকে এই চুল দিয়ে উইগ এবং হেয়ার এক্সটেনশন তৈরি করে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাজারজাত করা হয়। তবে বর্তমানে কাঁচামাল রপ্তানির পাশাপাশি দেশে চূড়ান্ত পণ্য বা প্রস্তুত উইগ তৈরির প্রবণতা ও উদ্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়িক প্রসারের দিক থেকে রাজধানীর উত্তরার ফয়দাবাদ ছাড়াও দিনাজপুর, ফরিদপুর ও নীলফামারীর মতো জেলাগুলোতে এই ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের জাপানিজ ইকোনমিক জোনে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে উইগ উৎপাদন চলছে, যা মূলত জাপান ও সিঙ্গাপুরে রপ্তানি করা হচ্ছে।
দেশে উইগ প্রস্তুত করে বিদেশে বাজারজাত করছে ‘উইগ বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আশরাফ জানান, “শুরুতে তারা কাঁচা চুল চীনে রপ্তানি করতেন। পরে দেশে উইগ তৈরি করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির উদ্যোগ নেন।” তিনি আরও জানান, বর্তমানে তাদের উৎপাদিত পণ্য ব্রাজিল এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে।
উইগ তৈরির প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘নটিং’। এই বিশেষ পদ্ধতিতে অত্যন্ত নিপুণ কৌশলে একেকটি চুল বসিয়ে পূর্ণাঙ্গ উইগ তৈরি করা হয়। দক্ষ কর্মীদের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ উইগ তৈরি করতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। এই কাজে নিয়োজিত একজন দক্ষ কর্মী প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, কেবল কাঁচামাল হিসেবে চুল রপ্তানি না করে দেশে প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের চূড়ান্ত পণ্য তৈরি করতে পারলে এই খাত থেকে বহুগুণ বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে আরও বেশি বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তির উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সহায়তার প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।