ঢাকার বেইলি রোড, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড ও গুলশান এলাকায় সরকারি বেশ কিছু বাংলো ও অ্যাপার্টমেন্ট নির্মিত হয়েছিল মন্ত্রীদের থাকার জন্য। সে জন্য এই এলাকাগুলো মন্ত্রিপাড়া নামে পরিচিত হলেও এখন সেখানে নির্বাচন কমিশনার, দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার, বিচারপতিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদধারীরা থাকছেন। এগুলো এখন শুধু মন্ত্রীদের থাকার জন্য সংরক্ষণ করতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার।

এমন ৭১টি বাংলোবাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট এরই মধ্যে চিহ্নিত করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি আবাসন পরিদপ্তর। সেগুলো শুধু মন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্টকরণের (এয়ারমার্ক) প্রস্তাব করা হয়েছে।

আবাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সাংবিধানিক পদে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য আলাদা বাসা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু সেখানে না থেকে তাঁরা মন্ত্রিপাড়ায় থাকছেন। এতে বাংলোবাড়ি ও বাসা ব্যবহারে নির্দিষ্টকরণের (এয়ারমার্ক) নীতির ব্যত্যয় ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে মন্ত্রিপাড়া এলাকায় অবস্থিত মোট ৭১টি বাংলো বাড়ি ও বাসা নির্দিষ্ট করে এয়ারমার্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আবাসন পরিদপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, বেইলি রোড, মিন্টো রোড ও হেয়ার রোড এলাকায় ৪১টি বাংলোবাড়ি ও বাসাকে মন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট করে ২০১৩ সালে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। গত বছরের ২২ অক্টোবর সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করে দেয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। নতুন করে মন্ত্রীদের জন্য বাড়ি নির্দিষ্ট করে দিতে গত ২ নভেম্বর সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতিমধ্যে তাঁদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে পুরোনো ৪১টির সঙ্গে নতুন করে ৩০টি বাসা যুক্ত করা হয়। নতুন ৩০টি বাসার মধ্যে বেইলি রোডে রয়েছে ১৯টি, গুলশানে ৫টি, ধানমন্ডিতে ৫টি, মিন্টো রোডে ১টি।

কমিটির আহ্বায়ক ও আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতিবেদনে তাঁরা ৭১টি বাড়িকে নির্দিষ্টকরণের জন্য সুপারিশ করেছেন। এখন সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

পুরোনো প্রজ্ঞাপন বাতিল করে কেন কমিটি গঠন করা হয়—এ বিষয়ে কথা হয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তাঁরা বলেন, মন্ত্রীদের জন্য যে আবাসন পরিকল্পনা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে ব্যবহারের মিল নেই। এ এলাকাগুলোতে কারা থাকতে পারবেন, সেটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে মন্ত্রীদের জন্য ৪১টি বাংলোবাড়ি ও ফ্ল্যাট নির্দিষ্ট করা হলেও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেখানে বিচারপতি ও সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিরা বসবাস শুরু করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এ সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে। যেহেতু দেশে এখন নির্বাচিত সরকার নেই, মন্ত্রীও নেই। তাই মন্ত্রিপাড়ার অনেক ফ্ল্যাট খালি ছিল।

আবাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাসা খালি থাকায় অনেককে মন্ত্রিপাড়ায় বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভা গঠিত হলে মন্ত্রিপাড়ায় নতুন মন্ত্রীদের আবাসনব্যবস্থা করতে গেলে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে। কারণ, সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের বাসা থেকে সরানো কঠিন হবে। তাই যাঁদের চাকরি শেষ হয়ে যাবে, তাঁরা বাসা ছেড়ে দেওয়ার পর নতুন কেউ যাতে মন্ত্রিপাড়ায় উঠতে না পারেন, সে জন্য নতুন করে বাসা নির্দিষ্টকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, এয়ারমার্ক করা ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাটে ভবিষ্যতে মন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি থাকতে পারবেন না, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রীদের জন্য নির্ধারিত আবাসন অন্যদের ব্যবহারে গেলে ভবিষ্যতে মন্ত্রীদের আবাসনসংকট দেখা দিতে পারে। কে কোন ক্ষমতা বা যুক্তিতে এসব বাংলোতে থাকছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ কারণেই এবার নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করে বাংলোগুলোকে মন্ত্রিপাড়ার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডে মন্ত্রীদের জন্য বাংলো বাড়ি আছে ১৫টি। এসব বাংলোতে এখন কয়েকজন উপদেষ্টা বসবাস করছেন। এ ছাড়া বেইলি রোডে ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’ নামের তিনটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনে ১০টি করে সেখানে ৩০ জন মন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা (ফ্ল্যাট) আছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার বর্গফুট। সেসব ফ্ল্যাটে এখন উপদেষ্টা, বিচারপতি, আমলা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বসবাস করছেন। ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’–এর ৩০টি ফ্ল্যাটকে নতুন করে মন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্টকরণ (এয়ারমার্ক) করে দেওয়া হচ্ছে। আগে নির্দিষ্টকরণ করা ছিল ১১টি।

কমিটির প্রতিবেদনে গুলশান ও ধানমন্ডিতে আটটি নতুন বাসা চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলো নির্দিষ্টকরণ করা নেই, সেসব বাসাকে নির্দিষ্টকরণের সুপারিশ করেছে কমিটি। গুলশানে সাবেক আইন মন্ত্রী আনিসুল হক (বর্তমানে কারাবন্দী) ৩৪ শতাংশ জায়গার ওপর একটি একতলা বাসায় থাকতেন। বাসাটি এখন খালি রয়েছে। গুলশানের ৮৪ নম্বর সড়কে ১০৬ শতাংশ জায়গার ওপর একটি বাংলো বাড়ি রয়েছে। এটি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার নামে রেজিস্ট্র দলিলকৃত। ধানমন্ডিতে আরেকটি বাড়ি রয়েছে সাবেক সচিব হেদায়েতউল্লাহ আল মামুনের নামে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রয়োজন বা অস্থায়ী সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব বাংলো বিভিন্ন ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে এ ধরনের বরাদ্দের ফলে একদিকে আবাসন নীতির অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে মন্ত্রিপাড়া এলাকার নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতাও বেড়েছে।

তবে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বর্তমানে যাঁরা এসব বাংলোতে বসবাস করছেন, তাঁদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।