নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যা মামলায় দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, তাজুল ইসলাম এ হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী। এতে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। এর মধ্যে তাজুল পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ এসব তথ্য জানিয়েছে।

আজ রোববার বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভুঁইয়ার কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন দুই আসামি ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) ও সাব্বির আহম্মেদ (২৫)। বিকেল পৌনে চারটায় শুরু হওয়া জবানবন্দি নেওয়া হয় সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। পরে বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জবানবন্দিতে দুই আসামি জানিয়েছেন, তাজুল ইসলামের সঙ্গে সাংবাদিক আলিফের আগে থেকেই বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তাঁরা তাজুলের সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন কাজ করতেন। সীমান্ত এলাকায় তাঁদের বিভিন্ন ব্যবসা ছিল। এসব ব্যবসায় আলিফ বাধা দিতেন এবং পুলিশকে তথ্য দিতেন। এসব কারণে আলিফের প্রতি তাঁদেরও ক্ষোভ ছিল।

ওসি আরও বলেন, দুই আসামির ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। তাজুল ইসলাম পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লোকজন চলে এলে তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।

জবানবন্দিতে তাজুল ছাড়া আরও কয়েকজনের নাম এসেছে জানিয়ে ওসি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করার লক্ষ্যেই তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

জবানবন্দিতে তাজুল ছাড়া আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করার লক্ষ্যেই তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, তাজুলের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক, অপহরণ, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানের ঘটনায়ও তাজুলের বাহিনী জড়িত। নিজ নামে এলাকায় একটি সন্ত্রাসী বাহিনীও চালান তিনি।

সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা (খাদিজা আক্তার) এর আগে মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, তাজুলের চোরাচালান ও অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য পেয়ে তা র‍্যাবকে দিয়েছিলেন আলিফ। বছর চারেক আগে তাজুলকে র‍্যাব (এখন এসআরবি) গ্রেপ্তার করেছিল।

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদের গত অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, তাজুলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য পেয়েছিলেন আলিফ। তাঁর (তাজুল) বাড়িঘরের ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করেছিলেন। তাজুল মনে করতেন, তাঁর কাছে থাকা অস্ত্রের তথ্যও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়েছেন আলিফ। এ নিয়ে ক্ষোভ থেকে আগেও আলিফের ওপর হামলা হয়েছিল।

গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

গতকাল শনিবার ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। এ নিয়ে সাংবাদিক আলিফ হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এর আগে ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আশা করছি, দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পারব। এরপর সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।’

ঢাকায় চাকরিতে যোগ দিয়েছেন আলিফের স্ত্রী এদিকে নিহত আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা (খাদিজা আক্তার) রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি কাজে যোগ দেন। দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন আনন্দিতা।

গারো সম্প্রদায়ের এই নারীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল আলিফের সঙ্গে। বিয়ের সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে তাঁর নাম হয় খাদিজা আক্তার।

স্বামীকে আর কখনো ফিরে পাব না; কিন্তু যারা তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমার দুই সন্তানকে এতিম করেছে, আমাকে স্বামীহারা করেছে, তাদের শাস্তি দেখে যেতে চাই। আমি তাদের ফাঁসি চাই।

গতকাল শনিবার রাতে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে আনন্দিতা সাংমা বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠতে খবর প্রকাশের পর অনেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। একজন নারী আমাকে ফোন করে সহযোগিতার কথা বলেছেন। আমার ব্যাংক হিসাবের নম্বর চেয়েছেন। এরপর আরও অনেকে ফোন করে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। চাকরির ব্যবস্থা হওয়ায় আপাতত অন্য কারও আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন নেই।’

আনন্দিতা আরও বলেন, ‘আমি চাই, তাজুল ইসলাম, শুটার শামীমসহ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। স্বামীকে আর কখনো ফিরে পাব না; কিন্তু যারা তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমার দুই সন্তানকে এতিম করেছে, আমাকে স্বামীহারা করেছে, তাদের শাস্তি দেখে যেতে চাই। আমি তাদের ফাঁসি চাই।’