কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা কলেজে চারটি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং অর্থ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা ও চাকরিপ্রার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। তারা কলেজের অধ্যক্ষ ও পরিচালনা কমিটির সভাপতির অবিলম্বে অপসারণ এবং বিতর্কিত নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। বিক্ষোভের এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা কলেজের ফটকের সামনে অধ্যক্ষ ও সভাপতির ছবি এবং কুশপুত্তলিকায় আগুন ধরিয়ে দেন।
গত রোববার (১ নভেম্বর) দুপুরে কচাকাটা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এই বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়। মিছিলটি স্থানীয় কচাকাটা বাজার প্রদক্ষিণ করে কলেজের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেই সময় পুলিশি পাহারায় কলেজের প্রধান ফটক বন্ধ থাকায় বিক্ষোভকারীরা ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তবে ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে তারা ফটকের সামনেই কলেজের সভাপতি ডা. মো. ইউনুস আলী ও অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম জুয়েলের ছবি এবং কুশপুত্তলিকায় আগুন জ্বালিয়ে তাদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে কলেজের ফটক খুলে দেওয়া হলে বিক্ষোভকারীরা কলেজ মাঠে জড়ো হয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীরা অভিযোগ করেন যে, মেধাতালিকায় যারা এগিয়ে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে পরিকল্পিতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, পরীক্ষার চার দিন পর ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডা. ইউনুস আলী ও অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম অপেক্ষাকৃত কম মেধাসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগ দিয়েছেন। এই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তারা তা বাতিলের দাবি জানান এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টায় কচাকাটা কলেজে কম্পিউটার কাম অফিস সহকারী, ল্যাব সহকারী, নৈশপ্রহরী ও আয়া—এই চারটি পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। উক্ত পদগুলোতে মোট ৪৫ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। নির্ধারিত সময়ে প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে উপস্থিত থাকলেও পরীক্ষা শুরু হতে দুপুর হয়ে যায়। লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ফল প্রকাশ না করে প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
প্রার্থীদের অভিযোগ, মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ফলাফল না জানিয়ে চার দিন পর তা প্রকাশের কথা বলা হয়, যা নিয়োগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি তাদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে একপর্যায়ে কচাকাটা থানা-পুলিশের সহায়তায় অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কলেজ ত্যাগ করেন।
চাকরিপ্রার্থীরা আরও অভিযোগ করেন যে, নিয়ম অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার মেধাক্রম অনুযায়ী ফল প্রকাশের পর মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। তাদের দাবি, ২৪ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ না করেই পরীক্ষক ও কলেজ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কলেজ ত্যাগ করেন। এরপর ২৭ অক্টোবর সকালে অধ্যক্ষ কলেজের নোটিশ বোর্ডে ফলাফল টাঙিয়ে দেন। তবে ফলাফলপত্রে ২৪ অক্টোবরের তারিখ ও স্বাক্ষর রয়েছে বলে তারা দাবি করেন। লিখিত পরীক্ষায় মেধাক্রমে এগিয়ে থাকা প্রার্থীরা নিয়োগ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই আন্দোলনে নামেন নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া অনিছূর রহমান তোলা ব্যাপারী অভিযোগ করেন, নিয়োগ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ডা. ইউনুস আলী ‘ফ্যাসিবাদী কায়দায়’ কলেজের সভাপতি হয়েছেন। তার দাবি, “দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ মাসের মধ্যে অবৈধভাবে নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে এবং কলেজকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা চলছে।” তিনি অভিযোগিত নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
এই পুরো অভিযোগের বিষয়ে কচাকাটা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম জুয়েল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তারা যে অভিযোগ তুলেছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ম্যাজিস্ট্রেট, উপাচার্য (ভিসি) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।”