কারও স্ট্রোক হলে চার ঘণ্টার মধ্যে যদি তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে (রিহ্যাবিলিটেশন) বিপুল খরচের বিষয়টি এড়ানো সম্ভব। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে সেভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। তবে ১০টি ফ্যাক্টর বা বিষয় মেনে চলতে পারলে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব; কিন্তু ওই ১০টি ফ্যাক্টরের অধিকাংশই বাংলাদেশে বিদ্যমান।

আজ রোববার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এসব কথা বলেন। বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে আকিজ মেডিপ্লেক্সের সহযোগিতায় এই বৈঠকের আয়োজন করেছিল মুক্তকণ্ঠ।

বৈঠকে আলোচনায় অংশ নিয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (এনআইএনএস) নিউরোলজি বিভাগের সাবেক প্রধান ও সিএমএইচের ভিজিটিং প্রফেসর মালিহা হাকিম বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে স্ট্রোকের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তাই সেখানে সবার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের কথা ভাবতে হবে। স্ট্রোক বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন এবং প্রতিরোধ (প্রিভেনশন) হিসেবে প্রাথমিক ঝুঁকিগুলো (প্রাইমারি রিস্ক ফ্যাক্টর) সবাইকে জানানো দরকার। দেশে অঞ্চলভিত্তিক অন্তত একটি করে থ্রম্বোলাইসিস সেন্টার করা প্রয়োজন। সরকার এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমা চালু করলে কাজটি আরও সহজ হয়। এ ছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কাটানোর জন্য ফিজিও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রয়োজন।

অধ্যাপক মালিহা হাকিম বলেন, ‘নারীদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের জন্য ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল, গেস্টেশনাল ডায়াবেটিস, প্রি–একলাম্পসিয়া, একলাম্পসিয়া এবং পোস্ট–মেনোপজাল হরমোনাল থেরাপি, ওবেসিটি ও মেটাবলিক সিন্ড্রোম খুবই গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টর। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তরুণদের মধ্যেও স্ট্রোকের ব্যাপকতা এখন বাড়ছে। তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহল ও অ্যাবিউজার যাতে না হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’

হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক যে এক বিষয় নয়, এ ব্যাপারেও সচেতনতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মালিহা হাকিম। তিনি বলেন, লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করেই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোককে আলাদা করা সম্ভব। স্ট্রোকবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। গবেষকদের নিজেদের কৃতিত্ব নেওয়ার মানসিকতা পরিহার করে রোগীর স্বার্থেই একযোগে কাজ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) জাহিদ রায়হান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। সরকার প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবাইকে পর্যায়ক্রমে ই–হেলথ কার্ড দেওয়া হবে। একটি কার্ডেই রোগীর সব তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং তার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসা দেওয়া হবে। এটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে যুক্ত থাকবে। সঠিক রেফারেল ব্যবস্থা, ই-টিকেটিং ও ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়ন হবে।

১০টি স্বাস্থ্যবিধি বা বিষয় মানতে পারলে ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানান ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ। তাঁর মতে, ওই ১০টি বিষয় হলো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন, অ্যালকোহল পরিহার, সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট করে হাঁটা, অতিরিক্ত ওজন কমানো, স্বাস্থ্যসম্মত সুষম খাবার খাওয়া, মানসিক চাপ (স্ট্রেস) পরিহার এবং হৃদ্‌রোগ থাকলে তার যথাযথ চিকিৎসা করানো।

এই ১০টি ঝুঁকির অধিকাংশই বাংলাদেশে প্রবলভাবে বিদ্যমান বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক শহীদুল্লাহ। ফাস্ট ফুড বা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার অভ্যাসের কারণে অল্প বয়সীদের মধ্যেও স্ট্রোকের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।

স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রসঙ্গে এনআইএনএসের নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, চল্লিশের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। তবে বাংলাদেশে জাঙ্ক ফুড গ্রহণের প্রভাবে স্থূলতা দেখা দেওয়ায় তরুণদেরও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। জাতীয় সমীক্ষা অনুযায়ী, জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে দেশের প্রতি চারজনের একজনের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে মাহবুবুল আলম বলেন, এর জন্য উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও তামাক সেবন পুরোপুরি বর্জন করা জরুরি। পারিবারিক ইতিহাস যাঁদের আছে, তাঁদেরও ঝুঁকি বেশি। এসব ঝুঁকি শনাক্ত করে কাজ করা গেলে স্ট্রোকের হার বহুলাংশে কমানো সম্ভব।

হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক এক বিষয় নয় উল্লেখ করে এনআইএনএসের সহকারী অধ্যাপক মো. নূর উদ্দিন (রনি) বলেন, ব্রেন অ্যাটাককে হার্ট অ্যাটাক মনে করে বা সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক রোগী প্রথমে হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট বা সাধারণ হাসপাতালে চলে যান। প্রকৃতপক্ষে স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ, যা কেবল মস্তিষ্কেই ঘটে; আর হার্ট অ্যাটাক হয় হৃৎপিণ্ডে।

স্ট্রোকের ধরন তুলে ধরে নূর উদ্দিন বলেন, মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে ওই অংশে মস্তিষ্কের কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে ক্ষেত্রে কিছু উপসর্গ দেখা যায়, সেটিই হচ্ছে স্ট্রোক। স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের—রক্ত সরবরাহ বন্ধ হলে হয় ইসকেমিক স্ট্রোক আর মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে হয় হেমোরেজিক স্ট্রোক। মোট স্ট্রোকের দুই-তৃতীয়াংশই ইসকেমিক স্ট্রোক। হেমোরেজিক স্ট্রোক আবার দুই রকম—মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ হলে হয় ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমোরেজ আর মস্তিষ্কের তিন স্তরের পর্দার ভেতরের দুই স্তরের মাঝখানে রক্তক্ষরণ হলে হয় সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ। সাময়িক রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে উপসর্গ দেখা দেওয়াকে ‘ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক’ বলে উল্লেখ করেন তিনি, যা ভবিষ্যতের বড় ধরনের স্ট্রোকের পূর্বাভাস।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজির অধ্যাপক মো. খাইরুল কবির বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলে ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজির অধ্যাপক হিসেবে থাকলেও আমার কোনো ক্যাপচার নেই, কোনো স্ট্রোক সেন্টার নেই। হাত–পা বেঁধে একটি পদে বসিয়ে দিলে আমি কী করব?’ তিনি আরও বলেন, স্ট্রোকের রোগীর পুনর্বাসনে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। রোগী স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়লে পরিবার চরম বিপাকে পড়ে। দ্রুত সুচিকিৎসার আওতায় আনলে এই ব্যয় ও ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকারি হাসপাতালে থ্রম্বোলাইসিসের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সুবিধা বিনা মূল্যে বা স্বল্প মূল্যে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. বাহাদুর আলী মিয়া বলেন, হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, শরীর দুর্বল হওয়া বা অবশ বোধ হওয়া, মুখ বাঁকা হওয়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়া স্ট্রোকের অন্যতম লক্ষণ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত মস্তিষ্কের বিশেষায়িত হাসপাতালে যেতে হবে।

ইউনিকো হাসপাতালের চিকিৎসক ইশিয়াক আহমাদ বলেন, স্ট্রোকের রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে আনা এবং পৌঁছানোর পরপরই কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করতে হবে। সরকারি উদ্যোগেই এই বিশেষায়িত চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে হবে।

এনআইএনএসের নিউরোলজির অধ্যাপক মাহমুদুল ইসলাম বলেন, জেলা বা প্রান্তিক পর্যায়ে নিউরো চিকিৎসার বিশেষায়িত কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় রোগীদের এনআইএনএসের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

মুক্তকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন এনআইএনএসের অধ্যাপক শামীম রশীদ। বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান মনিরা আক্তার মনি, স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেডের কনসালট্যান্ট মো. ওয়াহিদুর রহমান, এনআইএনএসের সহযোগী অধ্যাপক ইমরান সরকার, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক শরীফ উদ্দীন খান, আকিজ মেডিপ্লেক্সের চিফ বিজনেস অফিসার আবু জাফর ইকবাল আহামেদ এবং আকিজ রিসোর্সের চিফ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার মো. তৌফিক হাসান।