অনেকেই মনে করেন, সোলার প্যানেল কাজ করার জন্য সরাসরি সূর্যের আলো জরুরি। তাহলে যখন রোদ ওঠে না, তখন সোলার প্যানেল কীভাবে কাজ করে? আকাশে রোদ না থাকলেও কি এটি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে?
বিশেষ করে বর্ষাকালে, মেঘলা দিনে বা শীতকালে সূর্যের আলো কম থাকলে সোলার প্যানেল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনেকের সংশয় আছে। তবে সোলার প্যানেল শুধু সরাসরি রোদের ওপর নির্ভর করে না। এটি সূর্যের তাপ না, বরং আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করে। ফলে আকাশ মেঘলা থাকলেও দিনের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তবে আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি হতে পারে।
সোলার প্যানেল কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করে?
সোলার প্যানেল মূলত সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তর করে। এর জন্য ব্যবহার করা হয় ফটোভোলটাইক বা পিভি প্রযুক্তি। সূর্যের আলোতে থাকা ফোটন নামের ক্ষুদ্র কণা যখন প্যানেলের সৌরকোষে আঘাত করে, তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য প্যানেলের সরাসরি রোদ বা অতিরিক্ত তাপের প্রয়োজন নেই। সূর্যের আলো পেলেই এটি কাজ করতে পারে। এমনকি মেঘের আড়াল দিয়ে আসা আলোও সোলার প্যানেলের সৌরকোষে পৌঁছাতে পারে।
মেঘলা দিনে কি সোলার প্যানেল কাজ করে?
হ্যাঁ, মেঘলা দিনেও সোলার প্যানেল বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। কারণ আকাশে মেঘ থাকলেও সূর্যের আলো পুরোপুরি আটকে যায় না। কিছু আলো মেঘের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পৃথিবীতে পৌঁছায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ডিফিউজ সোলার রেডিয়েশন’ বলা হয়।
তবে পরিষ্কার আকাশে যতটা বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, মেঘলা দিনে সাধারণত তার চেয়ে কম হয়। মেঘের ঘনত্ব, আবহাওয়া আর সূর্যের আলোর পরিমাণের ওপর উৎপাদন নির্ভর করে।
PureSky Energy-তে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘন মেঘে ঢাকা দিনে সোলার প্যানেলের বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার প্রায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অন্যদিকে হালকা মেঘ থাকলে উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এগুলো আবহাওয়া ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।
অতিরিক্ত গরমে কি সোলার প্যানেলের কার্যকারিতা কমে?
অনেকের ধারণা, যত বেশি গরম হবে সোলার প্যানেল তত বেশি বিদ্যুৎ তৈরি করবে। কিন্তু বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক না।
সোলার প্যানেলের জন্য তাপের চেয়ে আলোর প্রয়োজন বেশি। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অনেক ধরনের সৌরকোষের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক ঠান্ডা আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত সূর্যের আলো থাকলে প্যানেল ভালোভাবে কাজ করতে পারে।
এ কারণে জার্মানি ও কানাডার মতো শীতপ্রধান দেশেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। শুধু প্রচুর রোদ পাওয়া যায় এমন দেশেই যে সোলার প্যানেল কার্যকর, তা কিন্তু না।
রাতে কি সোলার প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়?
রাতে সূর্যের আলো না থাকায় সোলার প্যানেল নিজে থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না। তবে দিনের বেলা সোলার প্যানেল থেকে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সঞ্চয় করার উপায় আছে। পরে রাতে বা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে সেই সঞ্চিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়।
এ জন্য সোলার প্যানেলের সঙ্গে ব্যাটারি ও উপযুক্ত ইনভার্টার ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে যেসব বাড়িতে নিয়মিত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, সেখানে ব্যাটারি ব্যাকআপের বিষয়টি আগে থেকেই বিবেচনা করা উচিত।
বৃষ্টি ও শীতের সময় সোলার প্যানেল যেভাবে কাজ করে
বৃষ্টির দিনে আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যেতে পারে। তবে দিনের আলো থাকলে প্যানেল কিছুটা বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হলে উৎপাদন আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
শীতের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা আলাদা। তাপমাত্রা কম থাকলেও পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া গেলে সোলার প্যানেল ভালোভাবে কাজ করতে পারে। তবে বরফ জমে প্যানেলের উপরের অংশ পুরোপুরি ঢেকে গেলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সোলার প্যানেল বসানোর আগে যে বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন
বাড়িতে সোলার প্যানেল বসাতে চাইলে কয়েকটি বিষয় আগে থেকেই বিবেচনা করা জরুরি।
বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা হিসাব করুন: প্রতিদিন কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তা জেনে প্রয়োজন অনুযায়ী প্যানেলের ক্ষমতা নির্ধারণ করুন।
ছাদের অবস্থান দেখুন: ছাদে পর্যাপ্ত আলো আসে কি না, আশপাশের ভবন বা গাছের ছায়া পড়ে কি না, তা পরীক্ষা করুন।
স্থানীয় আবহাওয়া বিবেচনা করুন: বর্ষাকাল ও মেঘলা দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমতে পারে। তাই সিস্টেম নির্বাচনের সময় বিষয়টি মাথায় রাখুন।
ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখুন: রাতে বা মেঘলা দিনে বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাটারির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ভালো মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করুন: প্যানেলের পাশাপাশি ইনভার্টার, ব্যাটারি ও ইনস্টলেশনের মানের দিকেও নজর দিন।
সোলার প্যানেল শুধু রোদেলা দিনের জন্য না। দিনের আলো থাকলে মেঘলা আবহাওয়াতেও এটি বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে। তবে সূর্যের আলো যত বেশি ও পরিষ্কার হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণও সাধারণত তত বাড়বে।
তথ্যসূত্র: PureSky Energy , TV9 Bangla