মানুষের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানে মসজিদের ভূমিকা অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি মসজিদের মর্যাদা ও গুরুত্বকে সর্বদা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
মদিনার পথে হিজরতের ঐতিহাসিক সফরে কোবায় পৌঁছে যেখানে প্রথম যাত্রাবিরতি করেন, সেখানেই তিনি ‘মসজিদে কোবা’ প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিক ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন, ‘মহানবী (সা.) কোবা পল্লীতে বনু আউফ গোত্রের মাঝে অবস্থান করলেন এবং সেখানেই এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন।’ (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/১৩৯)
পরবর্তীতে মদিনা মুনাওয়ারায় পৌঁছানোর পর তাঁর উটনি যেখানে হাঁটু ভেঙে বসে পড়েছিল, ঠিক সেই পুণ্যভূমিতেই তিনি পবিত্র ‘মসজিদে নববি’ নির্মাণ করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/১৪০-১৪১)
প্রকৃতপক্ষে, একজন মুসলিমের বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক জীবনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে মসজিদের আঙিনায়। মসজিদে নিয়মিত ‘ইলমি হালাকা’ বা পাঠচক্র পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হালাল ও হারাম, সত্য ও অসত্য এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য উপলব্ধি করতে শেখে। একটি প্রাণবন্ত মুসলিম সমাজে মসজিদ তার বহুমুখী শিক্ষামূলক ও গঠনমূলক ভূমিকা মূলত নয়টি মৌলিক ধারায় সম্পন্ন করতে পারে:
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও বৃহত্তর জমায়েতের কেন্দ্র: মসজিদ হলো সেই পবিত্র মিলনমেলা, যেখানে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাপ্তাহিক জুমার নামাজ এবং বিশেষ মুহূর্তের সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের নামাজ কিংবা অনাবৃষ্টির দিনে বৃষ্টির প্রার্থনার নামাজ (ইস্তিসকা) সমবেতভাবে আদায় করা হয়। এই সামষ্টিক ইবাদতগুলোর সুদূরপ্রসারী আত্মিক ও সামাজিক শিক্ষণীয় প্রভাব রয়েছে।
২. পাঠচক্র প্রতিষ্ঠা: মসজিদে নিয়মিত ‘ইলমি হালাকা’ বা পাঠচক্র পরিচালনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হালাল ও হারাম, সত্য ও অসত্য এবং কল্যাণ ও অকল্যাণের মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্য উপলব্ধি করতে শেখে। কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে, এই দায়িত্ব পালনের জন্য আধুনিক স্কুল ও মাদ্রাসাই যথেষ্ট কি না। এর উত্তর হলো, প্রচলিত স্কুল ও মাদ্রাসার নিজস্ব উপযোগিতা থাকলেও মসজিদে পাঠদানের এমন কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে পাওয়া অসম্ভব। যেমন—নবীজির হাদিসের হুবহু অনুসরণ, মসজিদে শিক্ষার অনন্য মর্যাদা ও বরকত, উন্মুক্ত ও বৈষম্যহীন সর্বজনীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক ও আর্থিক জটিলতামুক্ত পরিবেশ।
৩. নিয়মিত বয়ানের মাধ্যমে গণশিক্ষা: সাপ্তাহিক জুমার খুতবা এবং প্রতিদিনের সংক্ষিপ্ত ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সমকালীন বিষয়ে সচেতন করা এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
৪. নামাজে উদাসীনদের নিবিড় কাউন্সেলিং: মসজিদ কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মহল্লার যারা অলসতাবশত জামাতে আসে না, তাদের বাড়িতে গিয়ে আন্তরিকভাবে খোঁজ নেওয়া, তাদের সংশয় দূর করা এবং নামাজের গুরুত্ব কোমলতার সঙ্গে বুঝিয়ে দেওয়া।
৫. সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংহতি স্থাপন: মসজিদের দায়িত্বশীলরা নিজ মহল্লার প্রতিটি পরিবারের সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখবেন এবং ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে এক মজবুত সেতুবন্ধ তৈরি করবেন। ধনীদের উদ্বুদ্ধ করে তাঁদের কাছ থেকে জাকাত ও দান-অনুদান সংগ্রহ করবেন এবং তা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত অভাবীদের ঘরে পৌঁছে দেবেন।
৬. মুসল্লিদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধ রচনা: প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে সমবেত হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক জানাশোনা, আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে। নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত এবং পরস্পরের মাঝে ব্যাপকভাবে সালামের প্রসার ঘটানোর চেয়ে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার আর কোনো শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হতে পারে না। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পূর্ণ বিশ্বাসী (মুমিন) না হওয়া পর্যন্ত বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না; আর পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তোমরা পূর্ণ বিশ্বাসী হতে পারবে না। আমি কি তোমাদের এমন এক বিষয়ের কথা বলব না—যা চর্চা করলে তোমাদের পরস্পরের মাঝে ভালোবাসার সঞ্চার হবে? তোমরা নিজেদের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৪)
৭. নৈতিক গুণাবলির বিকাশ: জুমার খুতবা ও নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে ইসলামে নৈতিক চরিত্রের সুউচ্চ মর্যাদা এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারীদের জন্য প্রতিশ্রুত মহা-পুরস্কারের কথা জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘…যে ব্যক্তি নিজের চরিত্রকে সুন্দর ও নিষ্কলুষ করে গড়ে তোলে—আমি তার জন্য বেহেশতের সর্বোচ্চ শিখরে একটি সুরম্য প্রাসাদের জিম্মাদার হচ্ছি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮০০)
এই হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়, উত্তম চরিত্রের অধিকারীর স্থান আল্লাহর দরবারে কত উঁচুতে! তাই মসজিদের মিম্বর থেকে মানুষকে সদাচার ও নৈতিকতার নসিহত করা সবচেয়ে বেশি জরুরি; কারণ উত্তম চরিত্র এমন এক অনন্য ভূষণ, যা মানুষের যাবতীয় মানবিক ও ধর্মীয় সদ্গুণকে এক মোহনায় এনে মিলিয়ে দেয়।
৮. উপদেশের মাধ্যমে ভুলত্রুটি সংশোধন: মসজিদ পরিচালনাকারীদের একটি বড় নৈতিক কর্তব্য হলো—যাঁদের কোনো ধর্মীয় বা প্রায়োগিক বিষয়ে সংশোধনের প্রয়োজন, তাঁদের মার্জিত ও সুন্দর ভাষায় দিকনির্দেশনা দেওয়া। কাউকে শুধরে দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই কর্কশ ভাষা, রুক্ষতা কিংবা রূঢ় আচরণ প্রকাশ করা সমীচীন নয়। এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) আমাদের জন্য সর্বোত্তম জীবন্ত আদর্শ।
এক গ্রাম্য বেদুইন মসজিদে এসে হঠাৎ এক কোণে প্রস্রাব করতে শুরু করল। তা দেখে উপস্থিত সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ধমক দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিবৃত্ত করে বললেন, ‘তাকে বাধা দিয়ো না (প্রস্রাব শেষ করতে দাও)।’ লোকটি যখন নিবৃত্ত হলো, তখন মহানবী (সা.) এক বালতি পানি আনতে বললেন এবং সেই জায়গায় পানি ঢেলে তা সম্পূর্ণ পবিত্র করে দেওয়া হলো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮৪)
এই ঘটনার অন্তর্নিহিত শিক্ষা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সানআনি (রহ.) লিখেছেন, ‘এই ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা মেলে যে—অজ্ঞ মানুষের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে পরম কোমলতা অবলম্বন করতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই কঠোরতা প্রদর্শন করা চলবে না। এটি ছিল নবীজির অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য এবং শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্বের প্রতি তাঁর গভীর স্নেহেরই বহিঃপ্রকাশ।’ (আস-সানআনি, সুবুলুস সালাম, ১/৩৩)
৯. শিশুদের প্রতি স্নেহশীল আচরণ: মসজিদের দায়িত্বশীল ও মুসল্লিদের উচিত শিশুদের সঙ্গে অমায়িক ব্যবহার করা এবং তাদের কোনো ভুলত্রুটিতে দিকনির্দেশনা দেওয়ার সময় পরম স্নেহ ও কোমলতা বজায় রাখা; যাতে তারা কোনো অবস্থাতেই মসজিদবিমুখ ও আতঙ্কিত না হয়ে পড়ে।
একদিন মহানবী (সা.) মিম্বরে দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন সময় শিশু হাসান ও হোসাইন লাল জামা পরা অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করল। তারা হাঁটছিল আর টলমল পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। তা দেখে মহানবী (সা.) নিজের খুতবা অসমাপ্ত রেখেই তৎক্ষণাৎ মিম্বর থেকে নিচে নেমে এলেন; তারপর তাদের দুজনকে পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলে এনে নিজের সামনে বসালেন। এরপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহ যথার্থই বলেছেন—“তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি তো মূলত এক পরীক্ষা” (সুরা তাগাবুন: ১৫)। আমি এই কচি দুটি শিশুকে টলমল পায়ে হাঁটতে আর হোঁচট খেতে দেখে মনকে আর কিছুতেই ধরে রাখতে পারলাম না; তাই নিজের বক্তব্য থামিয়েই তাদের কোলে তুলে নিতে ছুটে এলাম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৭৪)
ঘটনাটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেছেন, ‘এই হাদিস প্রমাণ করে যে শিশুদের মসজিদে নিয়ে আসা সম্পূর্ণ বৈধ। এতে নবীজির অপার বিনয়, শিশুদের প্রতি গভীর মায়ামমতা এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এক অনুপম পাঠ রয়েছে, যা মূলত শিশু এবং তাদের মা-বাবার হৃদয়কে আশ্বস্ত ও প্রফুল্ল করার এক চমৎকার মাধ্যম।’ (ইবনে হাজার, ফাতহুল বারি, ১/৫৯২)
মসজিদ মূলত এমন এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান, যা মুসলিম সমাজের জ্ঞানতাত্ত্বিক, আত্মিক ও সামাজিক জীবনে এমন সব গভীর দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়, যা অন্য কোনো বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সংস্থার পক্ষে পূরণ করা অসম্ভব। তাই বর্তমান সময়ে মসজিদের সংস্কার ও পরিচালনায় গভীর মনোযোগ ও যত্নশীল হওয়া অপরিহার্য, যাতে এটি শুধু দৈনিক আধা ঘণ্টার উপাসনালয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে, সমাজ বিনির্মাণের সেই ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক নববি ভূমিকায় আবার ফিরে আসতে পারে।