ফুটবল মাঠের লড়াইয়ে একজন গোলকিপারের দায়িত্ব অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। গোল বাঁচাতে কখনো দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, কখনোবা শরীর বিলিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতে হয়। বলের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় নিজের শারীরিক কষ্টের কথা ভুলে যেতে হয় তাঁদের। তবে একটি আঙুলের চোট যে একজন গোলকিপারের জীবনকে কতটা বদলে দিতে পারে, তা এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অভিজ্ঞতা না শুনলে বোঝা সম্ভব নয়। ব্যথার প্রকৃত সংজ্ঞা এই আর্জেন্টাইন গোলকিপার নিজের জীবনেই গভীরভাবে অনুভব করেছেন।
চলতি বছরের মে মাসে অ্যাস্টন ভিলার হয়ে ইউরোপা লিগের ফাইনালে ফ্রাইবুর্গের মুখোমুখি হওয়ার আগে ওয়ার্মআপ করার সময় আঙুল ভেঙে ফেলেন মার্তিনেজ। আঙুলটি শুধু যে ভেঙেছিল তা নয়, বরং তা স্থানচ্যুতও হয়েছিল। স্ক্যান reports-এর মাধ্যমে চোটের ভয়াবহতা জানতে পেরে ৩৪ বছর বয়সী এই গোলকিপারের সামনে যেন এক অন্ধকার নেমে আসে। সামনেই ছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার লড়াই। এই গুরুতর চোটের কারণে তাঁর খেলা নিয়ে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, অস্ত্রোপচার করালে বিশ্বকাপ খেলা অসম্ভব হয়ে পড়ত। আর অস্ত্রোপচার না করালে তাঁকে বয়ে বেড়াতে হতো অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা।
শেষ পর্যন্ত মার্তিনেজ দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। এই কঠিন সিদ্ধান্তে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। বিশেষ নকশার অ্যাডিডাস গ্লাভস পরে মাঠে নামেন তিনি। আঙুলে ছিল ভারী ব্যান্ডেজ, যার ফলে বল ধরার স্বাভাবিক ক্ষমতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল তাঁর।
সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা সম্প্রতি আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গাস্তন এদুলের ইউটিউব চ্যানেলে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মার্তিনেজ জানান, আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন এক হাত দিয়ে ডাইভ দিতে হচ্ছিল তাঁকে। নিজের ভাষায় তিনি বলেন, “আমি তখন জম্বির মতো ডাইভ দিচ্ছিলাম। হাতটা মাটিতে রাখলেই চোখে তারা দেখতাম। ভয়াবহ যন্ত্রণা ছিল। প্রতিটি রাতে আমি কাঁদতাম। আমার আঙুলটা সসেজের মতো ফুলে থাকত।”
একজন গোলকিপারের কাছে হাতের চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু হতে পারে না। আর সেই হাতের আঙুল যখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না, তখন প্রতিটি সেভই হয়ে ওঠে এক চরম যুদ্ধ। মার্তিনেজ জানেন, তাঁর আঙুলটি আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না। এখনো তাঁকে ব্যথা নিয়েই খেলতে হচ্ছে। তবে দেশের জন্য এই ত্যাগের বিষয়ে তাঁর মনে কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি বলেন, “এটা আর কখনো আগের মতো হবে না। এখনো ব্যথা নিয়ে খেলছি। কিন্তু জাতীয় দলের জন্য এমন ঝুঁকি নিতেই হয়। আবারও একই কাজ করব।”
দেশের জন্য সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার উদাহরণ ফুটবলে অনেক থাকলেও মার্তিনেজের গল্পে মিশে আছে এক নির্মম বাস্তবতা। বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল বাঁচানোর জন্য যে হাতের প্রয়োজন, সেই হাতের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি জেনেও তিনি থেমে থাকেননি। তবে এই চোটের প্রভাব তাঁর ক্লাব ক্যারিয়ারেও পড়েছে।
গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময়ে জুভেন্টাসে যোগ দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল মার্তিনেজের। কিন্তু মেডিক্যাল পরীক্ষায় আঙুলের চোটের প্রকৃত অবস্থা সামনে আসতেই ভেস্তে যায় ইতালিয়ান ক্লাবটিতে যাওয়ার স্বপ্ন। এক্স-রে করার পর দেখা যায়, আঙুলটি আবারও ভেঙেছে। এই বিষয়ে মার্তিনেজ বলেন, “আমি এক্স-রে করিয়েছিলাম। দেখা গেল, আবার ভেঙেছে। এই আঙুলের কারণেই একটা ক্লাবে যাওয়ার দলবদল ভেস্তে যায়।”
জুভেন্টাসে যাওয়া হয়নি শেষ পর্যন্ত। এরপর মাত্র ৭৫ লাখ পাউন্ডের স্বল্প দলবদল ফি-তে চেলসিতে যোগ দেন এমিলিয়ানো। চেলসির মেডিক্যাল টিম শুরুতেই তাঁকে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছিল। তবে অস্ত্রোপচার করলে মৌসুমের শুরুতেই তাঁকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হতো। মার্তিনেজ চেয়েছিলেন আপাতত চোট নিয়েই খেলতে। তাঁর কথায়, “তারা বলেছিল, এভাবে খেলতে পারব। তবে অস্ত্রোপচার এক সময় লাগবেই। চেলসি এটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায়নি। কিন্তু একদিন আমার অস্ত্রোপচার করাতেই হবে।”
বর্তমানে আঙুলের চেয়েও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য একটি চোট। চলতি মাসের শুরুতে এভারটনের বিপক্ষে চেলসির জয়ের ম্যাচে তাঁর চোয়াল ভেঙে যায়। বর্তমানে লন্ডনের এই ক্লাবটির হয়ে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে দ্রুত প্রথম একাদশে ফিরে আসাই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য।
চোয়ালের চোট হয়তো দ্রুত সেরে যাবে, কিন্তু দেশের জন্য ঝুঁকি নিয়ে আঙুলে যে স্থায়ী ক্ষতি করেছেন মার্তিনেজ, তার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘকাল।