ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হলেও পরাজিত প্রার্থীর বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানোর ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করে এনসিপি নেতারা একে 'দ্বিমুখী আচরণ' হিসেবে অভিহিত করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বেসরকারিভাবে এই নির্বাচনে ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন, যিনি ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট পান। বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৪০৪। উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই।

নির্বাচন চলাকালীন বৃহস্পতিবারই ফলাফল ঘোষণার আগেই অনিয়ম, জালভোট এবং পোলিং এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল জামায়াত। তবে পরদিন শুক্রবার দুপুরে এক নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। ফুলের তোড়া নিয়ে জামায়াতের প্রার্থীর বাসায় যান মির্জা ফয়সল। সেখানে দুই প্রার্থী একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন এবং মিষ্টিমুখ করেন। পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা।

ঠাকুরগাঁওয়ে এই হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করলেও রাজধানীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। শুক্রবার দুপুরে মগবাজারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে আগে থেকেই ব্যালট পেপারে সিল মারা, জালভোট দেওয়া এবং কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সচিব ও প্রধান যদি অনিয়মকে অস্বীকার করেন, তাহলে বুঝতে হবে যাঁরা অনিয়ম করেছেন, তাঁদের সঙ্গে সিইসি ও ইসিসচিবের আঁতাত রয়েছে। তাঁরা সাংবিধানিক পদে বসে এই পদের প্রতি সুবিচার করেননি।”

জামায়াতের এই দ্বৈত অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন এনসিপি নেতারা। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং সংসদ সদস্য ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এই বিষয়ে সরব হয়েছেন। শুক্রবার শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে এনসিপির এক গণবিক্ষোভ সমাবেশে আসিফ মাহমুদ বলেন, “ঠাকুরগাঁওয়ে একটা উপনির্বাচন হয়েছে। সকাল থেকে আমরা দেখলাম বিভিন্ন জায়গায় প্রিসাইডিং অফিসাররা ব্যালটে সিল মেরে রেখেছেন, সেগুলো ধরাও খেয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা দেখি সরকারি প্রার্থী, তারপরে বিরোধীপ্রার্থী—তাঁরা একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। আমাদের গণতন্ত্র খুবই সংকটময় এবং দুরবস্থার একটি সময় পার করছে।”

আসিফ মাহমুদ আরও মন্তব্য করেন যে, মিষ্টি খাওয়ার এই চিত্রটি দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে কেন আগামীর রাজনীতিতে এনসিপি প্রয়োজন। তিনি বলেন, “কেন বাংলাদেশে একটা আপসহীন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল দরকার, সেটিও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ বুঝে যাচ্ছে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র, সুশাসন ও শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির জন্য এনসিপি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।”

অন্যদিকে, শনিবার সন্ধ্যায় যশোরের মুড়লি মোড়ে আয়োজিত খুলনা বিভাগীয় লংমার্চের পথসভায় কথা বলেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, “আমরা এখানে যাঁরা উপস্থিত হয়েছি, আমরা হচ্ছি বিরোধীদল। বিরোধী দলকে মনে করা হয়, বিকল্প সরকার। আমাদের সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিতে হবে। বিরোধী দলের যে ধরনের ভূমিকা, সে ধরনের ভূমিকা আমাদের দেখাতে হবে।”

ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “আমরা ঢাকায় বলব, ভোটে কারচুপি হয়েছে, আবার ফলাফল মেনে নেব। এ ধরনের বিরোধী দলের ভূমিকা দেখালে হবে না। যদি কারচুপি হয়ে থাকে, চোখে চোখ রেখে বলতে হবে সেটা কারচুপি হয়েছে। আমরা একবার বলব কারচুপি হয়েছে, আবার গিয়ে মিষ্টি খাইয়ে আসব—এ ধরনের বিরোধিতা হতে পারে না।”

উল্লেখ্য, ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ হলেও সম্প্রতি জামায়াত থেকে সাংগঠনিক দূরত্ব বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখতে দলটি এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শুক্রবার শাহবাগে গণবিক্ষোভ সমাবেশ করে এনসিপি এবং বিভিন্ন এলাকায় প্রচারপত্র বিতরণ করে।

খুলনা অভিমুখে লংমার্চে হাসনাত আবদুল্লাহসহ এনসিপির চার কেন্দ্রীয় নেতা অংশ নিলেও আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগ অভিমুখে লংমার্চে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব অংশ নিয়েছিলেন। খুলনা লংমার্চে শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতির বিষয়ে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এনসিপি জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোয় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতিটি দল আলাদাভাবে করবে, আমরা সেই জায়গাটাতেও ফোকাস করছি।”