রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চরম উৎকণ্ঠায় পড়েন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের বাসিন্দারা। উপজেলা কিংবা জেলা সদরের হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তাদের কোনো সড়কপথ নেই। দিনের বেলা ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে নদী পার হওয়ার সুযোগ থাকলেও বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর নিয়মিত ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জরুরি প্রয়োজনে তখন কেবল জেলেদের মাছ ধরার নৌকার ওপর ভরসা করতে হয় তাদের। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া করতে হয় অসহায় মানুষকে।
এমনই করুণ চিত্র দেখা যায় উপজেলার আজিমনগর, লেছড়াগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নে। পদ্মা, যমুনা ও ইছামতি নদীবেষ্টিত এই তিন ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হলো নৌকা। প্রায় ১৯ হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই নৌপথ। তবে তাদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জরুরি নৌযান কিংবা সার্বক্ষণিক নিরাপদ নৌপরিবহনব্যবস্থা নেই।
আয়তনের দিক থেকে মানিকগঞ্জের সবচেয়ে বড় উপজেলা হলো হরিরামপুর। ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলার মোট আয়তন ২৪৫ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, এই উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৯ জন। এর মধ্যে আজিমনগর ইউনিয়নে ৫ হাজার ১৭৬ জন, লেছড়াগঞ্জে ১২ হাজার ৮০৪ জন এবং সুতালড়িতে ১ হাজার ৫৮২ জন মানুষ বসবাস করেন।
তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে আজিমনগরের আয়তন ১৫ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার। ২৬টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এই ইউনিয়নটির আয়তন ও জনসংখ্যা বিবেচনায় মানুষের বসতি অত্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। লেছড়াগঞ্জের ১৭টি গ্রামের মোট আয়তন ১১ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে ১৪টি গ্রাম নিয়ে গঠিত সুতালড়ি ইউনিয়নের আয়তন ৬ দশমিক ৩৮ বর্গকিলোমিটার।
ঘাটই যাতায়াতের প্রধান ভরসা
তিন ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ হলো আন্ধারমানিক ঘাট থেকে হরিণাঘাট। এই পথে নদী পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিনিট এবং জনপ্রতি ভাড়া ৬০ টাকা। সকাল ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এই পথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার মানুষ এই পথটি ব্যবহার করেন। যদিও অন্য ঘাট দিয়েও নদী পারাপারের সুযোগ রয়েছে।
আন্ধারমানিক ঘাটের ট্রলার চালক মো. ফরিদ জানান, “যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের জন্য ঘাটে মোট ১২টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে। প্রতিদিন ছয়টি নৌকা চলাচল করে। মাস শেষে আয় থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ ১২ জন মালিকের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়।”
নদী পারাপারের ওপর এই চরম নির্ভরশীলতার কারণে কর্মজীবীদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে হয়। বিশেষ করে তিন ইউনিয়নের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের ভোরেই যাত্রা শুরু করতে হয়। ওই এলাকার কয়েকজন শিক্ষক বলেন, “সকাল ৭টার ট্রলার ধরতে হয় তাদের। সবকিছু ঠিক থাকলে সকাল আটটার দিকে হরিণাঘাটে পৌঁছানো যায়। এরপর মোটরসাইকেল কিংবা সাইকেলে করে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার পর আর ট্রলার পাওয়া যায় না। বর্ষাকালে নদী উত্তাল থাকলে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।”
রাতে অসুস্থ হলে মহাবিপদ
নদী পারাপারের সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে। দিনের বেলায় নির্ধারিত নৌযান থাকলেও সন্ধ্যার পর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে হয় স্বজনদের। অনেক সময় জেলেদের মাছ ধরার নৌকায় রোগীকে নদী পার করতে হয়। আবার নৌকা রিজার্ভ করতে গুনতে হয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা।
সুতালড়ি ইউনিয়নের চরডুবাইল গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মিয়া বলেন, “দিনে নৌকা পাওয়া গেলেও বিকেল সাড়ে ৫টার পর ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাতে কেউ অসুস্থ হলে দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া করতে হয়। দরিদ্র পরিবারের পক্ষে এ খরচ বহন করা কঠিন। নৌকা না পেলে জেলেদের মাছ ধরার নৌকাই শেষ ভরসা। এতে নদী পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সরকারিভাবে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হলে এলাকার মানুষের উপকার হতো।”
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেও ভোগান্তি
নদীপথের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। কলেজে যেতে প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ের ট্রলার ধরতে হয় তাদের। কোনো কারণে ট্রলার মিস করলে কিংবা নদী উত্তাল থাকলে সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিকেলে কলেজ ছুটির পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাটে ফিরতে হয়, কারণ বিকেল সাড়ে পাঁচটার পর নিয়মিত ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
নদী পার হয়ে নিয়মিত কলেজে যাতায়াত করা এক শিক্ষার্থী রকিবুল ইসলাম বলেন, “নদী পাড় হয়েই আমাদের কলেজ। অনেকে উপজেলা বা জেলা সদরে বাসা ভাড়া করে পড়াশোনা করেন। কিন্তু সবার পক্ষে তা সম্ভর না। প্রতিদিন কলেজে যাওয়ার জন্য সকালে ট্রলারে উঠতে হয়। নদীতে ঢেউ বা আবহাওয়া খারাপ থাকলে সময়মতো পৌঁছানো যায় না। আবার কলেজ থেকে ফিরতেও তাড়াহুড়া করতে হয়। কখনো ট্রলার মিস করলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। আমাদের জন্য নিয়মিত ও নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা করা হলে পড়াশোনার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হতো।”
ফসল পরিবহনেও ভোগান্তি
শুধু চিকিৎসা কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াত নয়, কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও নদীর ওপর নির্ভর করতে হয় এসব ইউনিয়নের কৃষকদের। উৎপাদিত ফসল বিক্রির জন্য নৌকায় করে ঝিটকা হাটে নিতে হয়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ায় নদী উত্তাল হয়ে উঠলে নৌযান চলাচল ব্যাহত হয়, ফলে সময়মতো ফসল বাজারে নিতে পারেন না কৃষকেরা।
কৃষক আরশেদ আলী বলেন, “আমাদের উৎপাদিত শস্য ঝিটকা হাটে নিতে নদীপথ ব্যবহার করতে হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ঘরে বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না। এ পথে নিরবচ্ছিন্ন নৌযাতায়াতের ব্যবস্থা করা হলে হাজারো মানুষ উপকৃত হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উপজেলা সদর, হাসপাতাল, বড় বাজার কিংবা প্রশাসনিক কার্যালয়ে যেতে তাদের নদী পার হতে হয়। ফলে প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজকর্মে সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেও একই ধরনের নির্ভরশীলতা রয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
নৌপথে নিয়মিত যাতায়াত করলেও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। আন্ধারমানিক ঘাটের বাসিন্দা আবেদ হাসান বলেন, “উত্তাল নদীতে চলাচল করা নৌকাগুলোতে যাত্রীদের জন্য লাইফ জ্যাকেট কিংবা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাসামগ্রী নেই। উপজেলা প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও এ পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। তিন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ নৌযান সার্ভিস চালু করে নিরাপদ ও নিয়মিত যাতায়াত নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মঈনুল ইসলাম খান বলেন, “হরিরামপুরের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন। উপজেলাকে রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বাঁধ নির্মিত হলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। নদীবেষ্টিত ইউনিয়নগুলোর মানুষের চলাচলের প্রধান বাহন ইঞ্জিনচালিত নৌকা। স্বল্পসংখ্যক মানুষের বসতির জন্য দীর্ঘ সেতু নির্মাণের বিষয়টি সমীক্ষায় আসবে না। তবে ওই এলাকার মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে কীভাবে উন্নত নৌযানসেবা দেওয়া যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে।”