বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত প্রেমিক যুগল হিসেবে পরিচিত ছিলেন সালমান খান ও ঐশ্বরিয়া রাই। ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ সিনেমার সেটে যে প্রেমের সূচনা হয়েছিল, তা একসময় বিয়ের স্বপ্নে রূপ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা তিক্ত বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়। সন্দেহ, অভিমান, পরিবারের প্রবল আপত্তি এবং গুরুতর দুর্ব্যবহারের অভিযোগ—এই সবকিছুর ভিড়ে তাঁদের সম্পর্কের পরিণতি হয়েছিল করুণ। আজ ১ নভেম্বর ঐশ্বরিয়ার জন্মদিন, আর এই বিশেষ দিনে ফিরে দেখা যাক তাঁদের জীবনের সেই বহুল চর্চিত সম্পর্কের বিভিন্ন দিক।

সালমান ও ঐশ্বরিয়ার ঘনিষ্ঠতার খবর প্রথম সামনে আসে সঞ্জয় লীলা বানসালির ‘হাম দিল দে চুকে সানাম’ ছবির শুটিং চলাকালীন। ১৯৯৯ সালে এই সিনেমার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। পর্দায় প্রেমিক-প্রেমিকার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে বাস্তব জীবনেও একে অপরের কাছাকাছি আসেন তাঁরা। সিনেমার পর্দায় তাঁদের রসায়ন দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল এবং ছবি মুক্তির পর তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়।

সেই সময়ে সালমান খান ছিলেন বলিউডের এক প্রতিষ্ঠিত সুপারস্টার। ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’, ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ এবং ‘করণ অর্জুন’-এর মতো ব্লকবাস্টার ছবির মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন। অন্যদিকে, ১৯৯৪ সালে মিস ওয়ার্ল্ড খেতাব জেতার পর ঐশ্বরিয়া রাই ধীরে ধীরে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন। সুন্দরী ও আত্মবিশ্বাসী এই অভিনেত্রীর প্রতি তখন পুরো বলিউডেরই ব্যাপক আগ্রহ ছিল।

বয়স, খ্যাতি কিংবা ক্যারিয়ারের অবস্থান—সব দিক থেকেই তাঁরা ছিলেন এক আদর্শ জুটি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁদের একসঙ্গে উপস্থিতি এবং শুটিংয়ের বাইরেও ঘনিষ্ঠতার খবর নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে জায়গা পেত। ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁদের এই প্রেম, যার ফলে সম্পর্কের সামান্যতম টানাপোড়েনও হয়ে উঠত বড় খবরের শিরোনাম।

অনেকের ধারণা ছিল তাঁদের এই সম্পর্ক কেবল সাময়িক আকর্ষণ নয়। বিভিন্ন প্রতিবেদন এবং ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্যে জানা যায়, দুজনই এই সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস ছিলেন এবং বিয়ের পরিকল্পনাও চলছিল। তবে ঐশ্বরিয়ার পরিবারের সঙ্গে সালমানের সম্পর্ক খুব একটা সুখকর ছিল না। সাংবাদিক হানিফ জাভেরি দাবি করেন, সালমানের পূর্বের প্রেম যেমন সোমি আলী ও সংগীতা বিজলানির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে ঐশ্বরিয়ার পরিবার বেশ আপত্তি জানিয়েছিল। ২০২৫ সালে ‘মেরি সহেলি’ পডকাস্টে বলিউডের বিতর্কিত প্রেম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে হানিফ বলেন, “সালমান ও ঐশ্বরিয়া দুজনই সম্পর্কটিকে পরবর্তী ধাপে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সালমানের নাম অন্য অভিনেত্রীদের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় ঐশ্বরিয়ার পরিবার তাঁকে নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেনি।”

তবে সাংবাদিকের এই দাবির বাইরে ঐশ্বরিয়া নিজে সম্পর্কের ভাঙনের একমাত্র কারণ হিসেবে পরিবারের আপত্তির কথা বলেননি। বরং তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যে সম্পর্কের ভেতরে বিদ্যমান আচরণ, সন্দেহ এবং দুর্ব্যবহারের অভিযোগগুলোই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রেমের শুরুর উচ্ছ্বাস সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিক্ততায় পরিণত হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঐশ্বরিয়ার সঙ্গে অন্য অভিনেতাদের নাম জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে সালমান তা মেনে নিতে পারতেন না। সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে ঐশ্বরিয়ার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর প্রবল সন্দেহ ছিল, যা পরবর্তী সময়ে খোদ ঐশ্বরিয়াও স্বীকার করেছেন।

২০০২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঐশ্বরিয়া জানান, বিচ্ছেদের পরও সালমান বিষয়টি মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি ফোন করে নানা কথা বলতেন এবং সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেন। ঐশ্বরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, শাহরুখ খান থেকে শুরু করে অভিষেক বচ্চন—বিভিন্ন সহ-অভিনেতার সঙ্গে তাঁর নাম জড়ানো হয়েছিল, যা সম্পর্কের জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

ওই সাক্ষাৎকারে ঐশ্বরিয়া আরও গুরুতর অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, সম্পর্কের চলাকালীন সালমান কখনো কখনো তাঁর সঙ্গে শারীরিকভাবে দুর্ব্যবহার করতেন। এমন মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েও তাঁকে স্বাভাবিকভাবে কাজে যেতে হতো। বাইরের চাকচিক্যের আড়ালে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছিলেন।

২০০১ সালের নভেম্বরের একটি ঘটনা তাঁদের সম্পর্কের অবনতির চূড়ান্ত পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক রাতে সালমান ঐশ্বরিয়ার মুম্বাইয়ের বাসায় গিয়ে দরজায় দীর্ঘক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করেন। ২০১৬ সালে ‘রেডিফ’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সালমানের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করা হয়। ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সালমান এই ঘটনার কথা স্বীকার করলেও দাবি করেন, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। সালমান তখন বলেছিলেন, “সম্পর্কের মধ্যে ঝগড়া হতেই পারে।” তাঁর মতে, ঝগড়া না হলে ভালোবাসার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে ঐশ্বরিয়ার পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি এবং নিজের আচরণের ভুলগুলো তিনি স্বীকার করেছিলেন।

ঐশ্বরিয়ার পেশাগত ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সালমানের সন্দেহ আরও প্রকট হয়। ২০২৫ সালে ভারতীয় অভিনেত্রী হিমানি শিবপুরি এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেন, সালমান কখনো কখনো শুটিং সেটে এসে ঐশ্বরিয়াকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। একবার ঐশ্বরিয়ার সৌন্দর্য নিয়ে সালমান বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন বলেও দাবি করেন হিমানি। যদিও সম্পর্কের চূড়ান্ত কারণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত কিছু বলেননি, তবে তিনি মনে করেন সম্পর্কের ভেতরের কথা দুজনই সবচেয়ে ভালো জানেন।

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ঐশ্বরিয়া আরও স্পষ্টভাবে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর অভিযোগ ছিল, সালমানের মদ্যপ অবস্থায় দুর্ব্যবহার, সন্দেহ, মানসিক চাপ এবং শারীরিক নির্যাতন তাঁকে এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেছে। ঐশ্বরিয়া বলেছিলেন, “তিনি সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে অনেক কিছু সহ্য করেছিলেন। কিন্তু এর বিনিময়ে তাঁকে মৌখিক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অবিশ্বস্ততা এবং অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়েছে।” শেষ পর্যন্ত আত্মসম্মানের খাতিরেই তিনি সম্পর্কটি শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন।

অন্যদিকে, সালমান খান শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘মিড-ডে’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ঐশ্বরিয়াকে তিনি কখনো মারধর করেননি।” তাঁর দাবি, আবেগের বশে তিনি নিজের ক্ষতি করতেন বা দেয়ালে মাথা ঠুকতেন, কিন্তু অন্য কাউকে আঘাত করেননি। ২০২৫ সালে এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে তাঁর এই পুরোনো বক্তব্য পুনরায় সামনে আসে, যেখানে তিনি ঐশ্বরিয়াকে আঘাত করার অভিযোগটি মিথ্যা বলে দাবি করেন।

বিচ্ছেদের পর বিতর্ক শেষ হয়নি। শাহরুখ খানের ‘চলতে চলতে’ সিনেমাটি এই বিতর্কের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ঐশ্বরিয়ার বিপরীতে অভিনয়ের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে রানি মুখার্জি তাঁর জায়গা নেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শুটিং চলাকালীন সালমানের উত্তেজিত আচরণ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব এই সিনেমার কাজে পড়েছিল।

অবশেষে ২০০৩ সালের ৬ এপ্রিল এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ঐশ্বরিয়া সালমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও পেশাগত সব সম্পর্ক শেষ করার কথা জানান। দুই পৃষ্ঠার ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন, “নিজের ভালো থাকা, মানসিক শান্তি, মর্যাদা এবং পরিবারের সম্মানের কথা ভেবেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” সালমান-অধ্যায়কে নিজের জীবনের ‘দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগেই তিনি সম্পর্কটি শেষ করেছিলেন, তবে এরপরও তাঁকে নানা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

বিচ্ছেদের পর দুই তারকা ভিন্ন পথে এগিয়ে যান। ঐশ্বরিয়া পরবর্তী সময়ে অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন এবং ২০০৭ সালের এপ্রিলে তাঁদের বিয়ে হয়। ২০১১ সালে তাঁদের কন্যা আরাধ্যার জন্ম হয়। অন্যদিকে, সালমান খান তাঁর ক্যারিয়ারে মনোনিবেশ করেন এবং ‘তেরে নাম’, ‘ওয়ান্টেড’, ‘দাবাং’, ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ ও ‘সুলতান’-এর মতো ছবির মাধ্যমে বক্স অফিসে নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন। তাঁর জীবনে একাধিক সম্পর্কের গুঞ্জন থাকলেও তিনি বিয়ে করেননি।

২০১২ সালে সিমি গারেওয়ালের টেলিভিশন শো ‘রঁদেভু উইথ সিমি গারেওয়াল’-এ অংশ নিয়ে ঐশ্বরিয়া অতীতের এই সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে অস্বীকার করেন। তিনি জানান, তিনি এই স্মৃতিগুলো নিজের জীবন থেকে সরিয়ে ফেলেছেন এবং অতীতকে অতীতেই রাখতে চান। তাঁর মতে, সেই অধ্যায়ের সঙ্গে সব নেতিবাচক অভিজ্ঞতার ইতি টেনেছেন তিনি এবং পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষায় তিনি আর এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না।