কোনো লেখকের নাম উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে যদি তাঁর কোনো লেখার কথা আপনার মনে পড়ে, বুঝে নিতে হবে ওই লেখক তাঁর লেখা দিয়েই আপনার কাছে পৌঁছেছেন। যেমন আবু ইসহাকের নাম শুনলেই আমাদের মনে পড়ে যায় তাঁর অমর উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ীর কথা। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাসটি পাঠকদের কাছে বিপুলভাবে সমাদৃত হওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে এই উপন্যাসে নিখুঁতভাবে পূর্ব বাংলার গ্রামীণ জীবনকে আঁকা হয়েছিল। সত্যি বলতে কি, অবিভক্ত ভারতের বাংলা সাহিত্যে গ্রামীণ জীবন বারবার বর্ণিত হলেও এবং আমাদের নমস্য পূর্বসূরি কথাশিল্পীরা অতি নিষ্ঠার সঙ্গে সে কাজটি করলেও, পূর্ব বাংলার জীবন তাতে খুব বেশি পাওয়া যেত না। সূর্য–দীঘল বাড়ীতে পাঠকেরা নিজেদের গ্রামকেই দেখতে পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন চলতি পথে যাদের চোখে পড়ে তাদের দেখাও। তবে এ–ও সত্যি, এই উপন্যাস সব পাঠকের জন্য নয়। মনোরঞ্জনের জন্য বা অলস সময় কাটাবার জন্য যাঁরা উপন্যাস পড়েন, এই উপন্যাস তাঁদের মোটেই ভালো লাগবে না; বরং জীবনের দুর্বহ বাস্তবতার নিপুণ ছবি দেখে তাঁদের মনের শান্তি বিঘ্নিত হবে। ঔপন্যাসিকের কাজ অবশ্যই পাঠককে আরাম দেওয়া নয়, আবু ইসহাক সে চেষ্টা কোনো দিন করেনওনি।

‘কোথায় দেখেছি সেটা আগে শোনো। আমি তখন সিভিল সাপ্লাইয়ে কাজ করি, পোস্টিং নারায়ণগঞ্জ। তো মাঝে মাঝে ট্রেনে করে ঢাকায় আসার সময় দেখতাম ওরা ট্রেনের মেঝেতে বসে আছে। প্রত্যেকের হাতে থলি। কোথায় যাচ্ছে? যাচ্ছে ময়মনসিংহে, ওখান থেকে চাল কিনে নারায়ণগঞ্জে কিছু বেশি দামে বিক্রি করে ওরা। এই ওদের পেশা। ওদের নাম যে জয়গুন বা এ রকম কিছু তা হয়তো নয়..।’

১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হলেও উপন্যাসটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৪৭ সালে, মাত্র একুশ বছর বয়সে! কীভাবে লেখা হয়েছিল ওই উপন্যাস, সেই গল্প শুনেছিলাম তাঁরই কাছ থেকে, এক ঘরোয়া আড্ডায়, আজ থেকে প্রায় তিরিশ বছর আগে। ওটাই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। অবশ্য আমি একা ছিলাম না, ছিল আমার মতো আরও কয়েকজন তরুণও। তখন লেখকদের সচরাচর দেখা যেত না, তাঁদের লেখা আসত আমাদের সামনে, তাঁরা থাকতেন আড়ালে, ফলে আমাদের মনের মধ্যে তাঁদের একটা কাল্পনিক মূর্তি তৈরি হতো। প্রথম দেখায় সেই কল্পনার সঙ্গে তাঁকে মেলানো গেল না। একেবারে সাদাসিদে সাধারণ একজন মানুষ, দেখলে মনেই হয় না, ইনিই সূর্য-দীঘল বাড়ীর সুবিখ্যাত লেখক। অত বড় লেখক, ঠিক কীভাবে আলাপ শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। তিনিই মৃদুহাস্যে এবং অনেকখানি প্রশ্রয় দিয়ে সহজ করে তুললেন পরিবেশ। অতঃপর আমরা একের পর এক প্রশ্ন করে চললাম: ‘এত অল্প বয়সে কীভাবে লিখলেন ও রকম উপন্যাস? ওই পাত্র–পাত্রীরা কি আপনার চেনা? ওই যে জয়গুন, হাসু, গেদু প্রধান, করিম বকশ, শফি, শমির মা?’

‘না, চেনা নয়, তবু তাদেরকে আমি দেখেছি।’ তিনি বললেন।

‘দেখেছেন? শুধু দেখেই এ রকম একটা উপন্যাস লেখা সম্ভব?’

‘কোথায় দেখেছি সেটা আগে শোনো। আমি তখন সিভিল সাপ্লাইয়ে কাজ করি, পোস্টিং নারায়ণগঞ্জ। তো মাঝে মাঝে ট্রেনে করে ঢাকায় আসার সময় দেখতাম ওরা ট্রেনের মেঝেতে বসে আছে। প্রত্যেকের হাতে থলি। কোথায় যাচ্ছে? যাচ্ছে ময়মনসিংহে, ওখান থেকে চাল কিনে নারায়ণগঞ্জে কিছু বেশি দামে বিক্রি করে ওরা। এই ওদের পেশা। ওদের নাম যে জয়গুন বা এ রকম কিছু তা হয়তো নয়..।’

‘কিন্তু এদের সঙ্গে সূর্য-দীঘল বাড়ীর সম্পর্ক কী?’

‘সেটা আবার আলাদা ব্যাপার। এদেরকে দেখে আমার মাথায় একটা গল্পের প্লট আসে। ভাবতে চেষ্টা করি, এরা কেন এত কষ্ট করে প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ যাওয়া-আসা করে? তার মানে, নিশ্চয়ই গ্রামে কোনো উপায় খুঁজে পায়নি। ঘর ছেড়ে তাই পথে নেমেছে। ভিক্ষা করছে না, কাজই করছে, কিন্তু তাদের এই নিত্য যাতায়াত, তা–ও ট্রেনের মেঝেতে বসে, বিনা টিকিটে, টিকিট চেকারের বকাঝকা শুনতে শুনতে, এসবই বলে দেয়, এরা স্বাভাবিক জীবন পায়নি, উপযুক্ত কাজও পায়নি, এমনকি হয়তো গ্রামে থাকতেও পারেনি। এরা কি তবে বাস্তুত্যাগী নাকি বাস্তুহারা? কেউ তো সহজে তার বাস্তুভিটা ত্যাগ করতে চায় না। তখনই আমার সূর্য-দীঘল বাড়ী নামটা মনে আসে। সূর্য-দীঘল মানে সূর্যের দিকে লম্বালম্বি। অর্থাৎ গ্রামের যে বাড়িটি পুব-পশ্চিম লম্বালম্বি করে বানানো হয় তাকে সূর্য-দীঘল বাড়ী বলে। তো আমার নানার গ্রামে এ ধরনের একটা বাড়ি ছিল। গ্রামের বাড়িগুলো সাধারণত উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি হয়, কারণ মানুষের বিশ্বাস সূর্য-দীঘল বাড়ীর লোকজন উজাতে পারে না, মানে এগোতে পারে না, অর্থাৎ টিকতে পারে না এবং জীবনযুদ্ধে হেরে যায়। আমার মনে হলো, এই যে মেয়েগুলো ট্রেনে করে যাওয়া-আসা করছে, তাদের ধরে নিয়ে আমার নানার গ্রামের ওই সূর্য-দীঘল বাড়ীটিতে বসিয়ে দিলে কেমন হয়? তাই দিলাম।’

‘তার মানে ওই বাড়িটিই মূল ব্যাপার? ওই বাড়ি, ওই গ্রাম, গ্রামের মানুষ..।’

‘হ্যাঁ, তাই।’

‘গ্রাম আপনি খুব নিবিড়ভাবে চেনেন, তাই না?’

‘আমি বড় হয়েছি গ্রামে। ম্যাট্রিক পাস করা পর্যন্ত আমার জীবন কেটেছে ওখানেই, এমনকি ট্রেন পর্যন্ত চোখে দেখিনি।’

তাঁর জন্ম ১ নভেম্বর, ১৯২৬, তৎকালীন মাদারীপুর (বর্তমানে শরীয়তপুর) জেলার শিরঙ্গল গ্রামে। ১৯৪২ সালে স্থানীয় এক স্কুল থেকে স্কলারশিপসহ ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৪ সালে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সঙ্গে তাঁর সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটে, বাবার আকস্মিক মৃত্যুর কারণে। পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি যোগ দেন সিভিল সাপ্লাইয়ের পরিদর্শক হিসেবে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে।

পাঠকেরা নিশ্চয়ই জানেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলায় যে ভয়াল আকাল নেমে এসেছিল, সূর্য–দীঘল বাড়ী সেই করুণ-ভয়াবহ-অকল্পনীয় কঠোর বাস্তবতা নিয়ে লেখা। এই কথা মনে রাখলে পড়তে পড়তে মনে হবে এ কথাও যে কেবল ওই বাড়িই নয়, পুরো দেশটিই যেন সূর্য-দীঘল। আর সে জন্যই এ দেশের মানুষ উজাতে পারছে না, টিকে থাকতে পারছে না এবং জীবনযুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বারবার।

যাহোক, শুরুতে এই উপন্যাসের কোনো প্রকাশকই পাচ্ছিলেন না তিনি। লেখার আট বছর পর কথাশিল্পী মনোজ বসুর সহায়তায় কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় এটি। আর তার পরের ইতিহাস আমরা জানি। উপন্যাস হিসেবে তো বটেই, চলচ্চিত্রায়ণের ফলে বাংলাদেশের কয়েক কোটি মানুষের কাছে উপন্যাসটির নাম পৌঁছে গেছে, পৌঁছেছে আবু ইসহাকের নামও।

২

বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে আবু ইসহাকের গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। তবু তিনি সেই আশ্চর্য লেখক, যিনি সর্বজনগ্রাহ্য হওয়া সত্ত্বেও সাহিত্য-সমাজের সঙ্গে কোনো দিন সম্পর্ক রক্ষা করে চলেননি। তাঁর এই বিচ্ছিন্নতা কি তাঁর অন্তর্মুখী-নিভৃতচারী স্বভাবের জন্য নাকি পেশাগত কারণে, ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। তিনি ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গোপনীয় বিষয়-আশয় নিয়ে তাঁকে কাজ করতে হতো, যেহেতু রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্ন যুক্ত ছিল তাঁর পেশার সঙ্গে। আবার অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে, নিজের উচ্চপদস্থ ভাবমূর্তি ব্যবহার করে সাহিত্য-সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার বা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কোনো চেষ্টাই তাঁর মধ্যে ছিল না। মাত্র একুশ বছর বয়সে রচিত জীবনের প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী দিয়েই তিনি চলে এসেছিলেন পাদপ্রদীপের আলোয়। সেই সময় কিন্তু তিনি ও রকম উঁচু পদধারী ছিলেন না। তাঁর জীবনও কিছু কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ব্যক্তি এবং লেখক আবু ইসহাকের কিছু তথ্য এখানে টুকে রাখি, তাতে ব্যাপারটা বুঝতে সুবিধা হবে।

তাঁর জন্ম ১ নভেম্বর, ১৯২৬, তৎকালীন মাদারীপুর (বর্তমানে শরীয়তপুর) জেলার শিরঙ্গল গ্রামে। ১৯৪২ সালে স্থানীয় এক স্কুল থেকে স্কলারশিপসহ ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৪ সালে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সঙ্গে তাঁর সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটে, বাবার আকস্মিক মৃত্যুর কারণে। পারিবারিক প্রয়োজনে তিনি যোগ দেন সিভিল সাপ্লাইয়ের পরিদর্শক হিসেবে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। সিভিল সাপ্লাইয়ের এই প্রতিষ্ঠানে চাকরিটি ছিল অস্থায়ী, সে জন্যই তাঁকে একসময় চাকরিটি হারাতে হয়। ১৯৪৯ সালে যোগ দেন পুলিশ বিভাগে, উপপরিদর্শক হিসেবে। এর মধ্যেই তিনি লিখে ফেলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস। কিন্তু প্রকাশক পাননি বলে ওটা তখনই গ্রন্থিত হতে পারেনি। ১৯৫১ সালে মাহে নও পত্রিকায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে, কিন্তু তারপরও কোনো প্রকাশক আগ্রহ দেখাননি ওটাকে গ্রন্থরূপ দিতে। ১৯৫৩ সালে তাঁকে বদলি করা হয় পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে, ঢাকায়। ইতিমধ্যে তিনি তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস, যেটি আসলে এক রহস্যোপন্যাস, জাল লেখা শেষ করেন। কিন্তু সেটি প্রকাশের আগেই সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রকাশ ঘটে কলকাতা থেকে ১৯৫৫ সালে এবং অচিরেই পরিণত হন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখকে।

১৯৫৬ সালে তাঁকে বদলি করা হয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থায়, করাচিতে। সেখানেই তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘতম সময়টি কেটেছে, পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনাও। ১৯৬০ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বই প্রকাশের ব্যাপারে তিনি যে কতখানি অনিয়মিত বা অনিচ্ছুক ছিলেন, সেটি তাঁর গ্রন্থগুলোর প্রকাশকালের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। ১৯৫৫ সালে সূর্য-দীঘল বাড়ীর পর প্রথম গল্পগ্রন্থ হারেম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। কিন্তু পাঠকেরা বইটির মুখ দেখার আগেই তা পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়। এই সংবাদ লেখক আমাদেরকে জানাচ্ছেন বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের সময়, কুড়ি বছর পর, ১৯৮২ সালে। তা, এত দিন লাগল কেন দ্বিতীয় সংস্করণ হতে? লেখক জানাচ্ছেন, তাঁর কাছে পাণ্ডুলিপিটির কোনো কপি ছিল না, অতএব নানা জায়গা থেকে গল্পগুলো জোগাড় করতে করতে বিশ বছর চলে গেছে। প্রথম গল্পগ্রন্থের এই পরিণতির ফলেই হয়তো দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থটি একটু তাড়াতাড়ি আলোর মুখ দেখেছিল। তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ মহাপতঙ্গ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। তারপর দীর্ঘ বিরতি। ১৯৮২ সালে হারেম-এর দ্বিতীয় সংস্করণ—এক অর্থে প্রথম সংস্করণই, কারণ এটিই পাঠকের কাছে পৌঁছেছিল। তারপর ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপ। এটির মুখবন্ধে লেখক আবার আমাদের জানাচ্ছেন, উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৬০ থেকে ১৯৮৫। পঁচিশ বছর! এক অর্থে এটিই তাঁর শেষ রচনা। কারণ, ১৯৮৯ সালে তাঁর রহস্যোপন্যাস জাল প্রকাশিত হলেও এটি তিনি লিখেছিলেন সেই ১৯৫০ দশকের গোড়ার দিকে। তাঁর শেষ প্রকাশিত গ্রন্থ স্মৃতি বিচিত্রা প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে।

লেখক হিসেবে আবু ইসহাকের পরিচিতি এবং খ্যাতি দুটোই এসেছে তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য–দীঘল বাড়ীকে ঘিরে। দ্বিতীয়টি রহস্যোপন্যাস জাল ততটা পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। তৃতীয় এবং শেষ উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপ তাঁর লেখকজীবনের শেষ দিকের রচনা, যদিও সেটি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালে। এটি প্রথমটির চেয়েও পরিণত এবং প্রসাদগুণসম্পন্ন উপন্যাস। যদিও ততটা আলোচনায় আসেনি, কিন্তু কী যে অসাধারণ মুনশিয়ানার সঙ্গে তিনি চরের জীবনকে তুলে এনেছেন, সত্যিই অবাক হতে হয়।

সাকল্যে এই তাঁর রচনা। প্রায় ষাট বছরের দীর্ঘ লেখকজীবনে দুটি উপন্যাস, দুটি গল্পগ্রন্থ, একটি রহস্যোপন্যাস, একটি স্মৃতিগদ্য! অবশ্য সেই ১৯৬০-দশক থেকেই তিনি একটি বড় কাজ করছিলেন—সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান রচনার কাজ। মৃত্যুর আগপর্যন্ত সেটি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে করে গেছেন এবং বাংলা একাডেমি থেকে দুই খণ্ডে তাঁর এই অসামান্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে (প্রকাশকাল: ১৯৯৩ ও ১৯৯৮)। কৌতূহলী পাঠকেরা ওগুলো হাতে নিলে সহজেই বুঝে যাবেন, কী অসাধ্য সাধন করেছিলেন আবু ইসহাক।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁকে বাধ্যতামূলক ছুটি দিয়ে গৃহবন্দী করে রাখা হয়, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বাঙালিদের পক্ষে কাজ করছিলেন (অভিযোগ মিথ্যা নয়)। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাঁর সেই বন্দিদশা কাটেনি। গোয়েন্দা সংস্থায় তাঁর এককালীন সহকর্মীরাই তাঁকে কঠোর নজরদারিতে রেখেছিলেন, যেন তিনি পালাতে না পারেন। ১৯৭৩ সালে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, নানা ছলচাতুরী করে, গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে, চোরাচালানিদের সহায়তা নিয়ে পাকিস্তান ত্যাগ করেন এবং আফগানিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এখানে আসার পর তিনি আবার নিয়োগ পান বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থায়, উপপরিচালক হিসেবে। ১৯৭৪ সালে তাঁকে বার্মার হাইকমিশনে ভাইস কনসাল হিসেবে বদলি করা হয়, ১৯৭৬ সালে ভারতের বাংলাদেশ হাইকমিশনে ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৭৯ সালে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয় জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থায়, খুলনা অঞ্চলের প্রধান হিসেবে। সেখানে বছর পাঁচেক দায়িত্ব পালনের পর তিনি অবসর গ্রহণ করেন ১৯৮৪ সালে।

দেখা যাচ্ছে, চাকরিসূত্রে জীবনের একটা দীর্ঘ সময় তিনি দেশের বাইরে কাটিয়েছেন, আর চাকরিটিও ছিল স্পর্শকাতর। কিন্তু অবসর গ্রহণের পরও তিনি বছর বিশেক বেঁচে ছিলেন, সচলও ছিলেন (তাঁর প্রয়াণ ঘটে ২০০৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি), তবু তাঁকে সাহিত্য-সমাজের নানা আয়োজনে দেখা যেত না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর নেই।

৩

লেখক হিসেবে আবু ইসহাকের পরিচিতি এবং খ্যাতি দুটোই এসেছে তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য–দীঘল বাড়ীকে ঘিরে। দ্বিতীয়টি রহস্যোপন্যাস জাল ততটা পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। তৃতীয় এবং শেষ উপন্যাস পদ্মার পলিদ্বীপ তাঁর লেখকজীবনের শেষ দিকের রচনা, যদিও সেটি লিখতে শুরু করেছিলেন ১৯৬০ সালে। এটি প্রথমটির চেয়েও পরিণত এবং প্রসাদগুণসম্পন্ন উপন্যাস। যদিও ততটা আলোচনায় আসেনি, কিন্তু কী যে অসাধারণ মুনশিয়ানার সঙ্গে তিনি চরের জীবনকে তুলে এনেছেন, সত্যিই অবাক হতে হয়। এত ছোট পরিসরে তো উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করা যায় না, আলোচনা করে উপন্যাসের সৌন্দর্য ও শক্তিমত্তার কিছু বোঝানোও যায় না, আশা করি পাঠকেরাও দুটো উপন্যাস নিজেই পড়ে নেবেন।

সংক্ষেপে এটুকু বলি যে আপনার যদি জানতে ইচ্ছা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বা তার কিছু আগে-পরে পূর্ব বাংলার মুন্সিগঞ্জ এলাকার পদ্মার চরের বা আশপাশের কোনো গ্রামের জনজীবন কেমন ছিল, কোনো ইতিহাস বইতে কি তার বর্ণনা পাবেন? বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে, তার রাজনীতি-কূটনীতি-অর্থনীতি-রণনীতি নিয়ে হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে, মোটাদাগে মানুষের ভোগান্তির প্রসঙ্গও আলোচিত হয়েছে, কিন্তু পূর্ব বাংলার কোনো এক অচেনা অঞ্চলের মানুষ তখন কেমন ছিল, তার বিবরণ আপনি কোথায় পাবেন? না, ইতিহাসগ্রন্থে তা পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে কোনো এক দরদি কথাশিল্পীর রচিত গল্প বা উপন্যাসে। কথাসাহিত্যের এক প্রধান কাজই হলো জনজীবনের স্মৃতি সংরক্ষণ, যদিও এটিই তার একমাত্র কাজ নয়। তেমনই এক কথাশিল্পী আবু ইসহাক, যিনি সেই সময়ের জনজীবনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন তাঁর অপূর্ব দুটো উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী ও পদ্মার পলিদ্বীপ-এ।

এবার তাঁর গল্প নিয়ে দু-চার কথা বলা যাক। আবু ইসহাকের দুটো উপন্যাসেরই বিষয়বস্তু গ্রামের মানুষ, গ্রামীণ সমাজ ও জীবন। কিন্তু গল্পে তিনি কাজ করেছেন বিবিধ বিষয় নিয়ে। তাঁর দুটো গল্পগ্রন্থভুক্ত একুশটি গল্পের মধ্যে ‘জোঁক’ ও ‘আবর্ত’—মাত্র এই দুটো গল্পে বিস্তারিতভাবে গ্রামীণ জীবন এসেছে। ‘দাদীর নদীদর্শন’, ‘শয়তানের ঝাড়ু’, ‘বোম্বাই হাজী’ প্রভৃতি গল্পে গ্রামীণ সমাজের দেখা মিললেও এগুলোর মূল উদ্দেশ্য গ্রামীণ সমাজ ও জীবনের বর্ণনা নয়; ধর্মীয় কুসংস্কারের জালে বন্দী মানুষের গল্প বলা হয়েছে এগুলোতে। অন্যদিকে ‘উত্তরণ’, ‘কানাভুলা’, ‘বিস্ফোরণ’ প্রভৃতি গল্প অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ নিয়ে লেখা হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের বহুবিধ সংকটের বর্ণনা নেই এসব গল্পে, রয়েছে সাধারণ মানুষদের মধ্যে অসাধারণ মানবিক বোধের উন্মোচনের গল্প। আবার ‘বনমানুষ’, ‘প্রতিবিম্ব’, ‘বর্ণচোর’ প্রভৃতি গল্পের বিষয়বস্তু নাগরিক জীবন। নাগরিক জীবন নিয়ে তাঁর গল্পগুলো গতানুগতিক নয় শহুরে মানুষ ও জীবনের মধ্যে লুকায়িত ভণ্ডামি ও শঠতার উন্মোচন রয়েছে কোনো কোনো গল্পে, কোনো গল্পে রয়েছে নাগরিক যন্ত্রণার নিখুঁত বিবরণ। তাঁর অতি বিখ্যাত গল্প ‘জোঁক’ শুধু এর অসাধারণ প্রতীকময়তার কারণেই স্মরণীয় হয়ে আছে বহু বছর ধরে। বেশ কিছু গল্পে আবু ইসহাক ধর্মীয় কুসংস্কারকে তীব্রভাবে বিদ্রূপ করেছেন। যেমন ‘কানাভুলা’, ‘প্রতিষেধক’, ‘বোম্বাই হাজী’, ‘শয়তানের ঝাড়ু’, ‘সাবীল’ ইত্যাদি। এই গল্পগুলোতে বিদ্রূপ আছে বটে, কিন্তু তা গল্পের মধ্যে এত সূক্ষ্মভাবে, এমন সুকৌশলে প্রবিষ্ট যে কখনো সেগুলোকে আরোপিত বা উচ্চকিত বলে মনে হয় না। এ ধরনের গল্পের মধ্যে ‘দাদীর নদীদর্শন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই রকম বিভিন্ন গল্পে সমাজের, জীবনের, মানুষের বিবিধ রূপ দেখিয়েছেন তিনি। গল্পগুলো তাই কেবল গল্পই থাকেনি, হয়ে উঠেছে তৎকালীন সমাজবাস্তবতা বোঝার জন্য এক উত্তম দলিল।

আমাদের জাতীয় জীবনে আবু ইসহাকের গুরুত্ব কোথায়? একটি বিশেষ কারণে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, তিনি এমন সব মানুষ নিয়ে লিখে গেছেন, যাদের কথা কোনো ইতিহাস বইয়ে লেখা হয় না। আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা তিনি লিখে গেছেন অবিকৃতভাবে, কোনো রকম ভণিতা ছাড়া, কোনো রকম প্রলেপ ছাড়া। তাদের সংস্কার-কুসংস্কার-মূল্যবোধ-বিশ্বাস-প্রেম-প্রীতি-ভয়-ঘৃণা-ক্ষোভ-বিদ্বেষ-জয়-পরাজয়—কোনো কিছুই তাঁর কলম থেকে ছুটে যায়নি। সর্বোপরি তিনি দেখিয়ে গেছেন এ দেশের অন্ত্যজ শ্রেণির প্রান্তিক মানুষদের নিরন্তর লড়াই—জীবনের পক্ষে, বেঁচে থাকার পক্ষে।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক